কুড়িগ্রাম জেলার সীমান্তঘেঁষা দুই উপজেলা রৌমারী ও রাজিবপুরে দীর্ঘসময় ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় জনজীবন পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। গত ২৫ মে (সোমবার) দুপুর ২টা থেকে শুরু হওয়া এই বিদ্যুৎ বিভ্রাট ২৬ মে (মঙ্গলবার) দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। দীর্ঘ ২১ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎহীন থাকায় এই দুই উপজেলার যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
Table of Contents
বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি
বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় মোবাইল অপারেটরগুলোর টাওয়ার সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এই অঞ্চলের মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। হাতেগোনা কয়েকটি সিম অপারেটরের অত্যন্ত দুর্বল সিগন্যাল পাওয়া গেলেও তা যোগাযোগের জন্য অপর্যাপ্ত। ব্রডব্যান্ড বা ওয়াইফাই সেবাও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
নিচে দুই উপজেলার বর্তমান সংকটের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:
| খাতের নাম | বর্তমান অবস্থা ও প্রভাব |
| বিদ্যুৎ সরবরাহ | টানা ২০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন। |
| মোবাইল নেটওয়ার্ক | টাওয়ার ব্যাকআপ না থাকায় নেটওয়ার্ক প্রায় শূন্য। |
| ইন্টারনেট সেবা | ওয়াইফাই এবং মোবাইল ডাটা উভয়ই বন্ধ। |
| পরিবহন | চার্জের অভাবে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও অটোভ্যান চলাচল সীমিত। |
| ব্যবসায়িক লেনদেন | সফটওয়্যার ও অনলাইন ব্যাংকিং সেবা অচল। |
| পবিত্র ঈদ-উল-আজহা | উৎসবের আগে কেনাকাটা ও মিষ্টি প্রস্তুতিতে চরম বিঘ্ন। |
জনজীবনে বহুমুখী সংকট
বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্কহীন এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দারা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সামনে ঈদুল আজহা থাকায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা: প্রবাসে বা দেশের অন্য প্রান্তে থাকা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে উৎসবের আগে আর্থিক লেনদেনের জন্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ওপর নির্ভরশীলরা বিপাকে পড়েছেন।
পরিবহন সংকট: এই দুই উপজেলার অভ্যন্তরীণ যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক। বিদ্যুৎ না থাকায় এগুলো চার্জ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে এবং যে অল্প কিছু গাড়ি চলছে, তারা স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া আদায় করছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা: মিষ্টির কারিগররা মোমবাতি বা কুপি জ্বালিয়ে কাজ করছেন। কাপড়ের দোকানে ক্রেতারা অন্ধকারের কারণে পণ্য পছন্দ করতে পারছেন না। ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
বিলের অসঙ্গতি: স্থানীয় গ্রাহকদের অভিযোগ, গত কয়েক দিন ধরে দিনে-রাতে গড়ে মাত্র এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও মাস শেষে তাদের অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।
পেশাজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের ভোগান্তি
অটোভ্যান চালক আব্দুল বাকি মিয়ার মতো শ্রমজীবীরা আয়ের পথ হারিয়েছেন। দৈনিক ১০০০ টাকা আয়ের স্থলে বর্তমানে তাদের আয় ১৫০-২০০ টাকায় নেমে এসেছে। একইভাবে শিক্ষার্থীরা তাদের মোবাইল বা ল্যাপটপ চার্জ দিতে না পেরে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বিচ্যুত হচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা জানান, তীব্র লোডশেডিংয়ের পর টানা বিদ্যুৎ বিভ্রাট তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।
প্রশাসনিক ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের বিষয়ে রাজিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সায়েকুল হাসান খান জানান, বিষয়টি উচ্চপর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে এবং দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে, জামালপুর পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির রৌমারী জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. দেলোয়ার হোসেনের সাথে এই সংকট বিষয়ে কথা বলার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। সরাসরি কল বা মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও তার পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
সীমান্তবর্তী এই দুই উপজেলার কয়েক লাখ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক পুনঃস্থাপনের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ।
