খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জুলাই ২০২৬, ১২:২১ এএম

ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের মিরাটে এক চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ। এক ব্যক্তিকে প্রথমে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করার পর বিছানায় বিষধর সাপ ছেড়ে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই লোমহর্ষক অপরাধের অভিযোগে নিহতের স্ত্রী এবং তাঁর প্রেমিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডটিকে স্রেফ একটি সাধারণ সাপের কামড়ের দুর্ঘটনা হিসেবে সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল নিহতের নামে থাকা ২০ লাখ রুপির বিমা দাবি আদায় করা এবং নিজেদের অবৈধ সম্পর্ককে বাধাগ্রস্ত না রাখা।
হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তির নাম অতুল পানওয়ার। তিনি তাঁর স্ত্রী দামিনীকে নিয়ে উত্তর প্রদেশের হস্তিনাপুরে ‘কৃষ্ণা কিডস প্লে স্কুল’ নামের একটি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা করতেন। ২০১৯ সালে অতুল ও দামিনীর বিয়ে হয়েছিল। গত শুক্রবার সকালে নিজের শোবার ঘরের বিছানা থেকেই অতুলের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী এবং সহযোগীদের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
নিহত অতুল পানওয়ার: প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালক এবং দামিনীর স্বামী, যাঁর নামে ২০ লাখ রুপির বিমা পলিসি ছিল।
দামিনী (প্রধান অভিযুক্ত): নিহতের স্ত্রী এবং বিদ্যালয়ের সহ-পরিচালক, যিনি পরকীয়া সম্পর্ক ও বিমার টাকার লোভে এই হত্যাকাণ্ড ঘটান।
তুষার ওরফে নিক্কি (সহ-প্রধান অভিযুক্ত): দামিনীর স্কুলের গাড়িচালক ও প্রেমিক, যিনি এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেন এবং নিজের স্ত্রীকে ডিভোর্স দেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন।
অন্যান্য সহযোগী: এই গোপন ষড়যন্ত্রে দামিনী ও তুষারের সঙ্গে আরও দুজন ব্যক্তি জড়িত ছিলেন, যাঁরা সাপ জোগাড় করাসহ বিভিন্ন কাজে সহায়তা করেছেন।
মিরাটের সিনিয়র সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ (এসএসপি) এই ঘটনার তদন্তে পাওয়া চমকপ্রদ সব তথ্য গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, স্কুল পরিচালনার আড়ালে দামিনী তাঁদের স্কুলেরই গাড়িচালক তুষার ওরফে নিক্কির সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন ধরে গোপনে চলে আসা এই সম্পর্কের প্রধান বাধা ছিলেন স্বামী অতুল। তাঁকে চিরতরে সরিয়ে দিতে এবং একই সঙ্গে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতে দামিনী ও তুষার হাত মেলান।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অতুলকে সরিয়ে দেওয়ার এটিই প্রথম চেষ্টা ছিল না। দামিনী ও তুষার প্রথমে একটি সড়ক দুর্ঘটনার নাটক সাজিয়ে অতুলকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু প্রথম প্রচেষ্টাটি ব্যর্থ হওয়ার পর তাঁরা আরও নৃশংস ও নিখুঁত এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন।
হত্যাকাণ্ডের রাতের বিবরণ: সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ (রুরাল) অভিজিৎ কুমার জানান, পরিকল্পনামাফিক দামিনী প্রথমে অতুলের রাতের দুধের সঙ্গে তীব্র মাত্রার ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেন। দুধ পানের কিছুক্ষণের মধ্যেই অতুল গভীর ঘুমে ঢলে পড়েন। এরপর দামিনী ও তাঁর সহযোগীরা মিলে একটি বিষধর সাপ এনে অচেতন অতুলের বিছানায় ছেড়ে দেয়। সাপটি কামড়ানোর পর বিষক্রিয়ায় অতুলের মৃত্যু হয়।
শুরুতে বিষয়টিকে গ্রামীণ অঞ্চলের একটি স্বাভাবিক সাপের কামড়ে মৃত্যুর ঘটনা মনে করা হলেও, পুলিশের মনে কিছু খটকা তৈরি হয়। অতুলের আকস্মিক মৃত্যুর চারপাশের পরিস্থিতি ও দামিনীর আচরণ সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তদন্তকারীরা ঘটনাটির চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করেন।
এরপরই তদন্তের মোড় ঘুরে যায়। পুলিশ সন্দেহভাজনদের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করতে শুরু করে। সেখান থেকে দামিনী ও তুষারের মধ্যকার অনবরত কথোপকথন, অপরাধের আগের গতিবিধি এবং মূল ষড়যন্ত্রের অকাট্য তথ্য-প্রমাণ তদন্তকারীদের হাতে আসে। এর পরপরই পুলিশ দামিনী ও তুষারকে হেফাজতে নেয় এবং ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁদের গ্রেপ্তার দেখায়। এই নৃশংস অপরাধের সঙ্গে জড়িত বাকি দুই পলাতক অভিযুক্তকে খুঁজে বের করতে এবং আইনের আওতায় আনতে পুলিশ বর্তমানে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
মন্তব্য