এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: ২০ই জুলাই ২০২৬, ১২:২৮ এএম

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ছড়ানো উত্তেজনার পারদ পাকিস্তানের সামনে এক কঠিন কৌশলগত প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। ইসলামাবাদ কি এখন তার নিজের অস্থির বেলুচিস্তান প্রদেশকে স্থিতিশীল করার দিকে মনোযোগ দেবে, নাকি আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ও মিত্রদের চাপে ইরানকে ঘিরে তৈরি হওয়া কোনো বৃহত্তর সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে? এই মুহূর্তে বিশ্বরাজনীতিতে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল প্রশ্ন।
বাস্তবতা হলো, পাকিস্তানের জন্য আজ সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ দূরবর্তী কোনো দেশ বা ইরান নয়; বরং তার নিজস্ব ভূখণ্ড, বিশেষ করে বেলুচিস্তান। বহু বছর ধরে এই অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর তত্পরতা, প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলা এবং সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে এসে বেলুচিস্তানে হামলার সংখ্যা ও প্রাণহানির হার আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। নিজের ঘরের এই অশান্ত পরিবেশ পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের রাতের ঘুম হারাম করে দিচ্ছে।
পাকিস্তানের ভূরাজনৈতিক সংকটের গভীরতা বুঝতে হলে কয়েকটি মৌলিক বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন:
সীমান্ত ও জনগোষ্ঠীর টান: পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সাধারণ সীমান্ত রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের চেয়েও বড় বিষয় হলো, এই সীমান্তের দুই পাশেই বেলুচ জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করে। স্বাভাবিকভাবেই ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে যদি কোনো অস্থিরতা দেখা দেয়, তবে তার সরাসরি ও নেতিবাচক প্রভাব পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে এসে পড়ে। ফলে ইসলামাবাদের নীতিনির্ধারকদের কাছে ইরানের স্থিতিশীলতা কেবল একটি প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি সরাসরি পাকিস্তানের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আঞ্চলিক মিত্রতা ও ভারসাম্যের খেলা: ইসলামাবাদের সামনে আরেকটি বড় মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা হলো ভারসাম্য রক্ষা। একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের গভীর কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে, যার ওপর দেশটির আর্থিক খাত অনেকটাই নির্ভরশীল। অন্যদিকে ঠিক ঘরের পাশে রয়েছে প্রতিবেশী ইরান, যার সঙ্গে সীমান্ত রক্ষা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ জড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির পর পাকিস্তান প্রকাশ্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং সরাসরি কোনো পক্ষে না গিয়ে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের চেষ্টা চালাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামাবাদ কোনো অবস্থাতেই ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়াতে চায় না। কারণ এমন সিদ্ধান্ত তাদের ভঙ্গুর অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।
বর্তমানে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে সংবেদনশীল সীমান্ত, আফগানিস্তানের অস্থিতিশীল সীমান্ত এবং বেলুচিস্তানের অভ্যন্তরীণ চরম নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এমন এক বহুমুখী চাপের মধ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো আন্তর্জাতিক সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া দেশটির জন্য এক প্রকার আত্মঘাতী হবে। এটি কার্যত তাদের জন্য “দ্বিমুখী বা ত্রিমুখী নিরাপত্তা সংকট” তৈরি করবে, যা সামলানোর সক্ষমতা রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদর দপ্তরের এই মুহূর্তে নেই।
সবকিছুর ওপরে রয়েছে অর্থনৈতিক নির্মম বাস্তবতা, যা পাকিস্তানকে সংযত থাকতে বাধ্য করছে। দেশটি তার দৈনন্দিন জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানির জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে বা হরমুজ প্রণালিতে সংঘাতের তীব্রতা বাড়লে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক লাফে আকাশচুম্বী হবে। এর ফলে পাকিস্তানের ওপর বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, আমদানি ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতি অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাবে, যা তাদের চলমান অর্থনৈতিক সংকটকে খাদের কিনারে নিয়ে দাঁড় করাবে।
সবদিক বিবেচনা করলে দেখা যায়, পাকিস্তানের সামনে আজ সবচেয়ে বড় যুদ্ধ ইরানের বিরুদ্ধে কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক জোটে যোগ দেওয়া নয়, বরং নিজের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার অবসান ঘটানো। বেলুচিস্তানে দীর্ঘস্থায়ী চরমপন্থী বিদ্রোহ, ভঙ্গুর অর্থনীতি, সীমান্ত পাহারা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা—এসবই ইসলামাবাদকে পা মেপে চলতে বাধ্য করছে। রাজনীতির চেনা ভাষায় বলা যায়, যে রাষ্ট্র নিজের ঘরের আগুন এখনো পুরোপুরি নেভাতে পারেনি, সে প্রতিবেশীর চিতায় ঝাঁপ দেওয়ার আগে বহুবার লাভ-ক্ষতির হিসাব কষে। পাকিস্তানের বর্তমান কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশলও মূলত সেই রূঢ় বাস্তবতারই এক স্পষ্ট প্রতিফলন।
লেখকঃ সম্পাদক ও প্রকাশক- জি-লাইভ ২৪
মন্তব্য