খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই জুন ২০২৬, ১১:৫৮ পিএম

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করার চাঞ্চল্যকর মামলায় আদালতে একে একে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন ভিকটিমের প্রত্যক্ষদর্শী স্বজন, প্রতিবেশী ও সাধারণ স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের স্বচক্ষে দেখা ঘটনার বিবরণ ও আইনি বক্তব্যে রামিসা হত্যার সেই বিভীষিকাময় ও লোমহর্ষক ঘটনার সম্পূর্ণ ভয়ংকর চিত্র অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। আজ মঙ্গলবার (২ জুন, ২০২৬) ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে এই হত্যা মামলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এদিন ভুক্তভোগী শিশু রামিসার বাবা, মা ও তার আপন বড় বোনসহ মামলার মোট ১৬ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর জবানবন্দি ও সাক্ষ্যগ্রহণ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করেন আদালত। আদালতে উপস্থিত হয়ে সাক্ষীরা রামিসার মাথাবিহীন দেহ উদ্ধার করার অবর্ণনীয় চিত্র, ঘরের ভেতরের রক্তাক্ত দৃশ্য এবং মূল অভিযুক্ত সোহেল রানার ভবন থেকে কৌশলে পালিয়ে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর বিবরণ বিশদভাবে তুলে ধরেন।
Table of Contents
আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণকালে শিশুটির বাবা এবং এই হত্যা মামলার মূল বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা ঘটনার দিনের ঘটনার ধারাবাহিক বর্ণনা দেন। তিনি জানান, ঘটনার দিন সকালে তিনি তার নিজ কর্মক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়ে যান। তার অফিস রাজধানীর কাকলী এলাকায় হওয়ায় তিনি ঢাকা সেনানিবাস বা ক্যান্টনমেন্ট হয়ে সেই দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। পথিমধ্যে সকাল আনুমানিক ১০টা থেকে ১০টা ১৫ মিনিটের মধ্যে তার স্ত্রী পারভীন আক্তার অত্যন্ত আকুল হয়ে তাকে ফোন করেন এবং জরুরি ভিত্তিতে অবিলম্বে বাসায় ফিরে আসার অনুরোধ জানান।
হান্নান মোল্লা আদালতকে বলেন, “স্ত্রীর ফোন পাওয়ার পর আমার পল্লবীর বাসায় ফিরে আসতে আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ মিনিট সময় লেগেছিল। এসে দেখি আমাদের ফ্ল্যাটের সামনের অংশে অনেক মানুষ জড়ো হয়ে আছেন। আমি আর কালবিলম্ব না করে দ্রুত ওপরে উঠে যাই।” তিনি আরও জানান, ওপরে গিয়ে তিনি দেখতে পান তার স্ত্রী অনেকক্ষণ যাবৎ পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় অনবরত ডাকাডাকি করছিলেন, কিন্তু ভেতর থেকে কেউ কোনো ধরনের সাড়া বা দরজা খুলছিল না। হান্নান মোল্লা জানান, পরে তিনিও প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা খোলার চেষ্টা করেন এবং একপর্যায়ে হাতুড়ি ব্যবহার করে দরজার লক ভেঙে ফ্ল্যাটের ভেতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। ভেতরে ঢোকার পর প্রথম যে দৃশ্যটি তার নজরে আসে, তা হলো টয়লেটের সামনে vanished সামান্য রক্ত পড়ে ছিল। সাক্ষ্যগ্রহণকালে তিনি আদালতকে আরও পরিষ্কার করে জানান যে, এই নৃশংস ঘটনার আগে তিনি আসামিদের ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না এবং প্রধান আসামিকে তিনি জীবনে কখনো দেখেননি।
আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে ভুক্তভোগী শিশুটির মা পারভীন আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে সেই দিনের ঘটনার অবতারণা করেন। তিনি বলেন, ঘটনার দিন যথারীতি তিনি তার বাসায় দুপুরের রান্না করছিলেন। রান্নার শেষ পর্যায়ে এসে হঠাৎ মেয়েকে আশেপাশে খুঁজে না পেয়ে তিনি ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত হয়ে পড়েন। এ সময় তার বড় মেয়ে বলছিল যে, শিশু রামিসা তো বাসাতেই থাকার কথা, তবে সে নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারেনি যে রামিসা কোনোভাবে বাইরে গেছে কি না।
পারভীন আক্তার আদালতকে বলেন, “আমি রান্না করার সময় একটি বাচ্চার গোঙানি বা চিৎকার শুনতে পেয়েছিলাম। কিন্তু তখন ভেবেছিলাম পাশের বাসার কোনো শিশু হয়তো স্বাভাবিকভাবে চিৎকার করছে। পরে বড় মেয়ে ঘরে ফিরে এলে আমি যখন ছোট মেয়ের খোঁজ করি, তখন সে জানায় রামিসা তো তার সঙ্গে বাইরে যায়নি।” এরপর তিনি ব্যাকুল হয়ে ভবনের নিচতলা, একটি অফিস কক্ষ ও ব্যাচেলর বাসাসহ ভবনের সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে মেয়েকে খুঁজতে থাকেন।
একপর্যায়ে ভবনের তৃতীয় তলায় পাশের একটি ফ্ল্যাটের দরজার সামনে গিয়ে তিনি হঠাৎ তার নিখোঁজ মেয়ের একটি জুতা দেখতে পান। তখন তার মনে তীব্র সন্দেহ জাগে যে, আগে শোনা চিৎকারটি সম্ভবত তার নিজের মেয়েরই ছিল। আদালতে তিনি অশ্রুসজল চোখে বলেন, “আমি বারবার ফ্ল্যাটের ভেতরে থাকা স্বপ্নাকে বলেছিলাম—বোন, তুই দরজাটা একটু খুলে দে। কিন্তু সে কোনোভাবেই দরজা খোলেনি।”
তিনি ও ash-pash-er লোকজন বারবার দরজায় অনবরত ধাক্কা দিলেও ভেতর থেকে কেউ সাড়াশব্দ দেয়নি। পরে আরও লোকজন জড়ো হয়ে দরজা ভেঙে যখন ভেতরে ঢোকেন, তখন তারা চারদিকে রক্ত দেখতে পান এবং সেখান থেকেই তার শিশুকন্যার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পারভীন আক্তার আদালতকে আরও জানান, দরজা ভাঙার পর ভেতরে থাকা অভিযুক্ত নারী আসামি স্বপ্না আক্তার সেখানে উপস্থিত লোকজনের সামনে স্বীকার করেছিল যে, সোহেল রানা শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে এখান থেকে পালিয়ে গেছে।
আদালতে মায়ের জবানবন্দি: “আমি বারবার স্বপ্নাকে বলেছি—বোন দরজাটা খুলে দে। কিন্তু সে দরজা খোলেনি।” পরে দরজা ভেঙে সেখান থেকে রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে রামিসার চাচি জানান, তার স্বামী তাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন যে রামিসাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। এই খবর শুনে তিনি দ্রুত সেখানে গিয়ে দেখেন পুরো বাসায় মানুষের উপচে পড়া ভিড় এবং স্বজনদের কান্নাকাটি চলছে। ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে খাটের নিচে এক পাশে তিনি রামিসার মাথাবিহীন নিথর দেহটি দেখতে পান। সেই সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করার কাজ করছিল। পরবর্তীতে জেরার মুখে তিনি জানান যে, তিনি নিজ চোখে রামিসার গলাকাটা মরদেহ দেখেছেন, তবে সরাসরি ধর্ষণের দৃশ্য তিনি দেখেননি।
মামলার অন্যতম সাক্ষী ও রামিসার চাচা মিজানুর রহমান লিটন আদালতে বলেন, “আমি যখন মেট্রোরেলে অবস্থান করছিলাম, তখন আমার স্ত্রী ফোন করে অত্যন্ত কান্নাকাটি করে জানান যে রামিসাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি দ্রুত বাসায় এসে দেখি ঘরের মেঝেতে রক্ত পড়ে আছে। এরপর দেখতে পাই ঘরের ভেতরে থাকা একটি বড় বালতির মধ্যে রামিসার বিচ্ছিন্ন মাথাটি রাখা ছিল। তার গলা এবং হাত ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাটা ছিল।” সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তিনি আদালতে উপস্থিত থাকা মামলার প্রধান দুই আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনকে নিজ আঙুলে শনাক্ত করেন।
উক্ত ভবনের অন্য একজন বাসিন্দা মনির হোসেন আদালতে জানান, সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যবর্তী সময়ে ভবনের ভেতরে অস্বাভাবিক হট্টগোল ও শব্দ শুনে তিনি নিচে নেমে আসেন। এসে দেখেন রামিসার মা পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল রানার বন্ধ দরজায় অনবরত ধাক্কা দিচ্ছেন। পরে সবার সহযোগিতায় দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তারা রক্ত দেখতে পান। তিনি আরও বলেন, “আমি ঘরের ভেতর স্বপ্নাকে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। তখন ভেতরের দিকের আরেকটি ভেতরের গেট শক্ত করে তালাবদ্ধ করা ছিল। সেই তালাবদ্ধ গেটটি খোলার পর আমরা রামিসার মাথাবিহীন মরদেহটি দেখতে পাই।”
প্রতিবেশী জাকিরুল ইসলাম রাজন আদালতে বলেন, রামিসার মায়ের আকুল ডাকাডাকি শুনে তিনি ঘটনাস্থলে ফিরে আসেন। দরজা না খোলায় পরে তারা ভেতরে ঢুকে প্রথমে বাথরুমে কিছু জামাকাপড় পড়ে থাকতে দেখেন এবং এরপর চারদিকে taaza রক্ত দেখতে পান। তিনি যখন স্বপ্নাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করেন, তখন সে কিছু জানে না বলে দাবি করে। পরে তারা ঘরের খাটটি উঁচু করলে খাটের নিচে রামিসার বস্ত্রহীন মরদেহ দেখতে পান এবং পাশে থাকা একটি বালতির মধ্যে তার বিচ্ছিন্ন মাথাটি উদ্ধার করা হয়।
মনির হোসেন: দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে রক্ত ও তালাবদ্ধ গেটের পেছনে মরদেহ দেখতে পান।
জাকিরুল ইসলাম: খাট উঁচু করে বস্ত্রহীন দেহ এবং বালতিতে মাথা উদ্ধারের বিবরণ দেন।
আবু সামা: জানালা বেয়ে খালি গায়ে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে নিচে নামতে দেখেন।
এই মামলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষ্য দিয়েছেন আবু সামা নামে এক প্রতিবেশী। তিনি আদালতে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “সকাল প্রায় ১০টার দিকে আমি আমার ঘরে বসে সকালের নাস্তা করছিলাম। ঠিক তখন হঠাৎ জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি পাশের বাসার জানালা বেয়ে এক ব্যক্তি খালি গায়ে অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে নিচে নেমে যাচ্ছে। আমি তাৎক্ষণিকভাবে তাকে চোর মনে করে অত্যন্ত জোরে ‘চোর চোর’ বলে চিৎকার শুরু করি। এর কিছুক্ষণ পরই পাশের বাসা থেকে কান্নাকাটি ও চিৎকারের শব্দ শুনে আমি সেখানে ছুটে যাই এবং রামিসার রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পাই।” পরবর্তীতে আইনি জেরার জবাবে তিনি বলেন, “घटना-র পর বিভিন্ন গণমাধ্যম ও মিডিয়ায় আসামির ছবি দেখে আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়েছি যে, সেদিন জানালা দিয়ে খালি গায়ে নেমে যাওয়া ব্যক্তিটিই আর কেউ নয়, স্বয়ং এই মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা।”
আরেক সাক্ষী মনিরুজ্জামান শাহীন আদালতে বলেন, তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে একটি পাতলা ধারালো ছুরি এবং বালতির মধ্যে অবরুদ্ধ অবস্থায় রামিসার মাথা দেখতে পান। এছাড়া পুলিশ সদস্য রুমা আক্তারও এই দিন আদালতে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দেন, তবে তার সাক্ষ্যের কিছু বিশেষ কারিগরি অংশ পরে আদালতের নথিতে উপস্থাপন করা হয়।
সকল সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ হওয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষের নিয়োজিত বিজ্ঞ আইনজীবী আজিজুল রহমান দুলু উপস্থিত সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, “আজ আদালতে সাক্ষীদের দেওয়া জবানবন্দি ও বক্তব্যে মামলা প্রমাণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অকাট্য তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষ করে ভুক্তভোগী শিশুটির পিতা ও মাতার প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যে ঘটনার যে লোমহর্ষক এবং নির্মম বর্ণনা উঠে এসেছে, তা আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আসামি সোহেল রানা নিষ্পাপ শিশুটিকে পাশবিক উপায়ে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যা করার পর ঘরের জানালার গ্রিল কেটে বা জানালা বেয়ে নিচে নেমে পালিয়ে যাওয়ার যে বিষয়টি সাক্ষ্যতে উঠে এসেছে, তা আবু সামার মতো নিরপেক্ষ প্রতিবেশীর বক্তব্যে সম্পূর্ণরূপে প্রমাণিত হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল এই সমস্ত নির্ভরযোগ্য ও অকাট্য সাক্ষ্য-প্রমাণপত্র আমলে নিয়ে মামলার পরবর্তী আইনি কার্যক্রমের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
মন্তব্য