যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যান করল ইসরায়েল

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি আকস্মিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের পক্ষ থেকে গত রোববার গভীর রাতে এই চুক্তি সম্পাদনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এই ঘোষণার পরদিন সোমবার সকাল থেকেই ইসরায়েলের সরকারি মহল এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঐতিহাসিক চুক্তির কথা প্রকাশ করে জানান, অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানানো যাচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের মধ্যে একটি সফল শান্তিচুক্তি সই হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বিরোধ মীমাংসার জন্য পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছিল।

পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই চুক্তির মূল শর্তগুলোর মধ্যে লেবাননসহ সব যুদ্ধক্ষেত্রে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান ও শত্রুতা বন্ধের সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাকিস্তান এবং ইরান উভয় রাষ্ট্রই লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ অবসানের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এই শর্তটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, তাঁদের দেশ এই চুক্তির কোনো শর্ত মানতে আইনত বাধ্য নয়। এই রাজনৈতিক বিরোধিতার পরপরই সোমবার ইসরায়েলি বিমান ও স্থলবাহিনী দক্ষিণ লেবাননজুড়ে নতুন করে ধারাবাহিক ও তীব্র সামরিক হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এই শান্তি আলোচনা সফল করতে সহযোগিতা করার জন্য ইসরায়েলের চিরবৈরী রাষ্ট্র তুরস্ক, কাতার এবং সৌদি আরবকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি আরও জানান, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চুক্তির প্রধান শর্ত ও বিভিন্ন পক্ষের অবস্থান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্পাদিত চুক্তির মূল বিষয়বস্তু এবং এর প্রেক্ষিতে বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়া ও অবস্থান নিচে ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

সংশ্লিষ্ট পক্ষ ও দেশসমূহশান্তিচুক্তির মূল শর্ত ও বর্তমান অবস্থান
মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানআগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রপ্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন চুক্তিটি সম্পূর্ণ হয়েছে।
ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানআগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।
ইসরায়েল সরকারচুক্তি সরাসরি প্রত্যাখ্যান এবং লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখা।
চুক্তির প্রধান শর্তলেবাননসহ সব যুদ্ধক্ষেত্রে স্থায়ীভাবে শত্রুতা ও সামরিক অভিযান বন্ধ।

ইসরায়েলি প্রশাসনের তীব্র প্রতিক্রিয়া ও সার্বভৌমত্বের দাবি

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখনো এই চুক্তির বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেননি। তবে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি জানিয়েছেন যে, ইসরায়েল এই চুক্তি মানতে বাধ্য নয় এবং লেবানন নিয়ে ইরানের কোনো শর্ত বা দাবি তাঁরা কোনোভাবেই মেনে নেবেন না। প্রধানমন্ত্রীর এই অবস্থানের সূত্র ধরে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ স্পষ্ট করে বলেছেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়াই লেবানন, সিরিয়া এবং গাজার নিরাপত্তা অঞ্চলগুলোতে তাদের সামরিক অবস্থান বজায় রাখবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইসরায়েলের দখলে থাকা বিতর্কিত এলাকাগুলো থেকে বেসামরিক নাগরিকদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হবে এবং ওই অঞ্চলের বেসামরিক ঘরবাড়িগুলোকে সন্ত্রাসী অবকাঠামো হিসেবে আখ্যা দিয়ে উচ্ছেদ ও ধ্বংস করা হবে।

চরম কট্টরপন্থী ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, ইরানের সঙ্গে এই চুক্তি ইসরায়েল এবং পুরো মুক্ত বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য চরম ক্ষতিকর। তিনি দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলকে এখন সম্পূর্ণ একাই ইরানের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে হবে। সম্প্রতি লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর হামলার জবাবে বৈরুতের বহুতল ভবনগুলো মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন এই মন্ত্রী। চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও লেবাননে সেনাবাহিনীকে পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করার অনুমতি দেওয়া অব্যাহত রাখা হবে বলে তিনি জানান।

অন্যদিকে, ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির মার্কিন প্রশাসনের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, ট্রাম্পের এই চুক্তি আমাদের ওপর কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অধীনস্থ বা পুতুল রাষ্ট্র নয়, আমরা একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। এই উগ্রপন্থী মন্ত্রী দাবি করেন, এই চুক্তি ইসরায়েলের নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারবে না। ইসরায়েল কোনো দুর্বল রাষ্ট্র নয় যে এই চুক্তি তাদের বেঁধে রাখতে পারবে। সরকারের সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহর জানিয়েছেন, তাঁদের সরকার শুধু একটি বিষয়েই আগ্রহী—ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র আছে কি নেই। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইসরায়েল যদি দেখে তার নিরাপত্তা বিপন্ন, তবে সে ইরানের ওপর তীব্র আঘাত হানবে, যার ফলে ইরানিরা শুধু হাঁটু গেড়েই বসবে না, বরং তাদের মাথাও নত করতে হবে।

আমেরিকার ভূমিকা ও নেতানিয়াহুর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট

ইসরায়েলের মন্ত্রীরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরাসরি সমালোচনা এড়িয়ে গেলেও, দেশের বিরোধী দল ও ডানপন্থী শিবিরের নেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এমনকি নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ডানপন্থী সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকেরাও ট্রাম্পের এই নীতিকে চরম বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ইসরায়েলের একটি জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক ইনন মাগাল লিখেছেন, ইরান ও লেবাননের যুদ্ধে ইসরায়েলকে সম্পূর্ণ একা ফেলে দেওয়া হয়েছে। তিনি ট্রাম্পকে একজন পরাজিত ব্যক্তি এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে ঘৃণ্য ব্যক্তি বলে অভিহিত করেন। একই চ্যানেলের আরেক সাংবাদিক শিমন রিকলিন বলেন, এ মুহূর্তে ইসরায়েলের সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন, তা হলো নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং ইসরায়েলের নিজস্ব স্বার্থের কথা এই বিশ্বাসঘাতক আমেরিকাকে মনে করিয়ে দেওয়া।

ইসরায়েলের বিখ্যাত গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ইসরায়েল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি ফোরাম’ এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরানের বর্তমান সরকারের সঙ্গে যেকোনো চুক্তিই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য। এখন লেবানন ও ইরান থেকে আসা নিরাপত্তা হুমকি দূর করার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস না করার উপযুক্ত সময়। এই চুক্তির ফলে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাঁর নেতৃত্ব ও যুদ্ধনীতির তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন। মধ্য-বামপন্থী দল ‘দ্য ডেমোক্র্যাটস’-এর নেতা ইয়ার গোলান নেতানিয়াহুকে অত্যন্ত দুর্বল ও জনবিচ্ছিন্ন হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ট্রাম্প এমন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, যা ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বহাল রেখেই দেশটির শত কোটি ডলারের অবরুদ্ধ সম্পদ তাদের হাতে ফিরিয়ে দেবে। সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও বর্তমান সরকারের কঠোর সমালোচনা করে একে একটি ব্যর্থ ও সিদ্ধান্তহীন সরকার হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং আগামী নির্বাচনে এই নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।