দেশের ক্রমবর্ধমান যানবাহন খাতকে রাজস্ব কাঠামোর আওতায় আনতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে সরকার। প্রথমবারের মতো মোটরসাইকেল এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে অগ্রিম আয়করের (AIT) আওতায় আনার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সোমবার বাজেটসংশ্লিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের সভায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই প্রস্তাবনায় নীতিগত সম্মতি প্রদান করেছেন।
Table of Contents
কর কাঠামোর সম্প্রসারণ ও যৌক্তিকতা
বর্তমানে প্রচলিত রাজস্ব আইন অনুযায়ী, ব্যক্তিগত গাড়ি, জিপ, মাইক্রোবাস, বাস, ট্রাক এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশার মালিকদের প্রতি বছর ফিটনেস নবায়নের সময় নির্দিষ্ট হারে অগ্রিম আয়কর দিতে হয়। তবে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দীর্ঘদিন এই করের আওতার বাইরে ছিল। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এই সুবিধা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
মূলত রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক যানবাহনকে একটি সুশৃঙ্খল আইনি কাঠামোর মধ্যে আনাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। আয়কর আইন ২০২৩-এর বিধান অনুযায়ী, এই অগ্রিম কর পরবর্তী সময়ে মালিকের বার্ষিক আয়কর রিটার্নের সঙ্গে সমন্বয় করার সুযোগ থাকবে।
প্রস্তাবিত করের হার ও শ্রেণিবিভাগ
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, যানবাহনের ধরন, ইঞ্জিন সক্ষমতা (সিসি) এবং পরিচালনার এলাকার ওপর ভিত্তি করে করের হার ভিন্ন হবে। নিচে প্রস্তাবিত করের হারের একটি রূপরেখা প্রদান করা হলো:
সারণি: যানবাহনভেদে প্রস্তাবিত বাৎসরিক অগ্রিম আয়করের হার
| যানবাহনের ধরন | বিভাজন/ভিত্তি | প্রস্তাবিত বার্ষিক কর (টাকা) |
| মোটরসাইকেল | সিসিভেদে (ইঞ্জিন ক্ষমতা) | ২,০০০ — ১০,০০০ |
| ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা | এলাকাভেদে (শহর/গ্রাম) | ১,০০০ — ৫,০০০ |
| সিএনজিচালিত অটোরিকশা | বিদ্যমান হার অনুযায়ী | পূর্বনির্ধারিত হার প্রযোজ্য |
নিবন্ধনের চ্যালেঞ্জ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সঠিক সংখ্যা নিয়ে সরকারি কোনো পরিসংখ্যান নেই, কারণ এই যানবাহনগুলো এতদিন নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতার বাইরে ছিল। তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি ও অনানুষ্ঠানিক জরিপ অনুযায়ী, সারা দেশে বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র ঢাকা মহানগরীতেই ১২ থেকে ১৫ লাখ অটোরিকশা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
এই বিপুল সংখ্যক যানবাহনকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে সরকার গত বছর ‘বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে। এই নীতিমালার প্রধান শর্তাবলি হলো:
প্রত্যেকটি যানবাহনের বৈধ নিবন্ধন সনদ থাকতে হবে।
প্রতি বছর হালনাগাদ ফিটনেস সনদ নিশ্চিত করতে হবে।
নিয়মিত ট্যাক্স টোকেন সংগ্রহ করতে হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃক নির্ধারিত হারে শুল্ক ও কর প্রদান করতে হবে।
বিশেষজ্ঞ মতামত ও অর্থনৈতিক প্রভাব
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, মোটরসাইকেল বা অটোরিকশা মালিকদের জন্য এই কর প্রাথমিক পর্যায়ে কিছুটা আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে তিনি উল্লেখ করেন যে, যারা মোটরসাইকেল ক্রয় করার সামর্থ্য রাখেন, তাদের দেশের রাজস্বে অবদান রাখার সক্ষমতাও রয়েছে।
তবে অটোরিকশার ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি সতর্কবার্তা দিয়েছেন। যেহেতু অটোরিকশার একটি বড় অংশ অনিবন্ধিত এবং গ্রাম ও মফস্বল পর্যায়ে ছড়িয়ে আছে, তাই নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে কর আদায় করা দাপ্তরিকভাবে বেশ জটিল হতে পারে। রেজিস্ট্রেশন বা বার্ষিক ফিটনেস যাচাইয়ের মাধ্যমেই মূলত এই কর আদায়ের পরিকল্পনা করছে সরকার। এই উদ্যোগ সফল হলে দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
