মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ছাড়াই স্থবির হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি ফলশ্রুতিতে ওই অঞ্চলে নতুন করে তীব্র সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে নতুন করে একটি ‘আত্মরক্ষামূলক’ সামরিক হামলা পরিচালনা করেছে। একই সাথে মার্কিন বাহিনী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নৌযান, বাণিজ্যিক জাহাজ ও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর লক্ষ্যবস্তু অভিমুখে ইরানের ছুড়ে দেওয়া একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকহীন বিমান বা ড্রোন আকাশেই ধ্বংস ও প্রতিহত করার দাবি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের সম্ভাব্য হামলা প্রচেষ্টার জবাব দিতে এবং তা নস্যাৎ করতে হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত ইরানের বৃহত্তম দ্বীপ কেশমে এই সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ডের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, কেশম দ্বীপে চালানো এই সুনির্দিষ্ট হামলায় মূলত ইরানের একটি সামরিক স্থল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক জলসীমা দিয়ে আইনসম্মতভাবে চলাচলকারী বেসামরিক নাবিকদের লক্ষ্য করে ইরানের ছুড়ে দেওয়া তিনটি চালকহীন বিমান বা ড্রোনও মার্কিন সামরিক বাহিনী গুলি করে সফলভাবে ভূপাতিত করেছে।
এদিকে এই মার্কিন অভিযানের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। ইরান সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, মার্কিন হামলার প্রতিশোধ বা পাল্টা জবাব হিসেবে তারা একটি ‘আঞ্চলিক দেশে’ অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকহীন বিমান বা ড্রোন দিয়ে সফল হামলা চালিয়েছে। তবে মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড ইরানের এই দাবি আংশিক নাকচ করে দিয়ে পাল্টা দাবি করেছে যে, তেহরান কুয়েতের দিকে দুটি এবং বাহরাইনের দিকে তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে সেই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর সব কটিই মাঝপথে বিধ্বস্ত করা হয়েছে অথবা সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে।
কয়েক মাস ধরে চলা মধ্যপ্রাচ্যের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে গত সপ্তাহের শেষভাগে একটি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি বা ঐকমত্য ছাড়াই সেই শান্তি আলোচনা শেষ হয়। এই যুদ্ধবিরতি আলোচনা থমকে থাকার সরাসরি ফল হিসেবেই নতুন করে এই ভয়াবহ পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটল। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি এই হামলার পর এক কঠোর হুঁশিয়ারি সংকেত জারি করেছে। তারা সতর্ক করে বলেছে যে, হরমুজ প্রণালির সার্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত করার চেষ্টা করা হলে আগ্রাসী মার্কিন সামরিক বাহিনীকে এর জন্য অত্যন্ত চড়া মূল্য দিতে হবে।
মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর পাল্টাপাল্টি হামলার বিবরণী
চলমান সামরিক সংঘাতের অংশ হিসেবে উভয় পক্ষের পরিচালিত অভিযান ও দাবিকৃত ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ নিচে সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| আক্রমণকারী পক্ষ | আক্রান্ত লক্ষ্যবস্তু ও ভৌগোলিক অবস্থান | ব্যবহৃত সামরিক সরঞ্জাম ও দাবিকৃত ফলাফল |
| যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী | কেশম দ্বীপ, হরমুজ প্রণালি (ইরান) | ইরানের একটি সামরিক স্থল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র লক্ষ্য করে ‘আত্মরক্ষামূলক’ হামলা সম্পন্ন। |
| যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী | আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক জলসীমা | বেসামরিক নাবিকদের লক্ষ্য করে ইরানের ছুড়ে দেওয়া ৩টি চালকহীন বিমান বা ড্রোন ভূপাতিত। |
| ইরানের সামরিক বাহিনী | একটি নামহীন আঞ্চলিক দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি | যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকহীন বিমান দ্বারা পাল্টা হামলা। |
| ইরানের সামরিক বাহিনী | কুয়েত ও বাহরাইনের দিকে অবস্থিত লক্ষ্যবস্তু | কুয়েতের দিকে ২টি এবং বাহরাইনের দিকে ৩টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ (মার্কিন দাবিমতে মাঝপথে প্রতিহত)। |
| যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী | হরমুজ প্রণালি (ইরানের নৌ সীমানা) | নৌ অবরোধের অংশ হিসেবে ইরানগামী একটি খালি তেলবাহী ট্যাংকারে আঘাত করে সেটি বিকল করা। |
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও চলমান উত্তেজনা
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা বাহরাইন এবং কুয়েতের বিভিন্ন কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে ইরান এর আগেও একাধিকবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সাম্প্রতিকতম এই পাল্টাপাল্টি হামলার ঠিক পূর্বেই মার্কিন केंद्रीय কমান্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, হরমুজ প্রণালিতে ওয়াশিংটনের একক নৌ অবরোধের অংশ হিসেবে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানগামী একটি খালি তেলবাহী ট্যাংকারে সুনির্দিষ্ট আঘাত হেনেছে। মার্কিন বাহিনীর সেই হামলায় তেলবাহী বাণিজ্যিক জাহাজটি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়ে।
শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর এই ধরনের একের পর এক সামরিক উসকানি ও পাল্টাপাল্টি হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলেছে।
