ফুটবল ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব অধ্যায় হিসেবে প্রথমবারের মতো মোট ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপ। যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার মাটিতে আয়োজিত হতে যাওয়া এই বৈশ্বিক আসরটি কেবল দলের সংখ্যার দিক থেকেই নয়, বরং অভাবনীয় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের কারণেও বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসে একটি বিশেষ ও স্মরণীয় স্থান করে নিতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনের এই মেগা টুর্নামেন্টে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা অফিশিয়াল ম্যাচ বল ‘অ্যাডিডাস ট্রাইওন্ডা’ হতে যাচ্ছে সম্পূর্ণ একটি ব্যাটারিচালিত স্মার্ট বল। আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন এই বলটি ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর (VAR) ব্যবস্থাকে আগের চেয়ে আরও অনেক বেশি নির্ভুল ও নিখুঁত করতে সরাসরি সাহায্য করবে।
Table of Contents
৫০০ হার্টজ গতির মোশন সেন্সর প্রযুক্তি
বিশ্বখ্যাত ক্রীড়া সামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাসের তৈরি এই বিশেষ বলটির ভেতরে রয়েছে ৫০০ হার্টজ (Hz) গতির একটি অত্যন্ত উন্নতমানের মোশন সেন্সর। এই বিশেষ সেন্সরটি ফুটবলারদের পায়ের প্রতিটি স্পর্শ, বলের নিখুঁত গতিপথ, শূন্যে ঘূর্ণন এবং যেকোনো ধরনের ছোটখাটো নড়াচড়াও তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম। বলের এই সার্বিক গতিবিধি এবং ডেটা বা তথ্যগুলো সেন্সরের মাধ্যমে একদম রিয়েল-টাইমে সরাসরি ভিএআর সিস্টেমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যাবে। এর ফলে মাঠের রেফারিদের জন্য অফসাইড নির্ধারণ, হ্যান্ডবল সনাক্তকরণসহ ম্যাচের বিভিন্ন সময় তৈরি হওয়া বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো আরও দ্রুত, স্বচ্ছ এবং নিখুঁতভাবে গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
চার্জিং ক্ষমতা ও হাইবারনেশন মোড
উদ্বেগহীনভাবে খেলা পরিচালনার স্বার্থে অ্যাডিডাস নিশ্চিত করেছে যে, বলের ভেতরের সেন্সরটিকে সার্বক্ষণিক সচল রাখার জন্য প্রতি ম্যাচের আগে একটি বিশেষ চার্জিং স্টেশনে বলগুলোকে বৈদ্যুতিক চার্জ দেওয়া হবে। আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি এই ব্যাটারিটি একবার পূর্ণ বা ফুল চার্জ করা হলে বলটি ফুটবল মাঠে টানা প্রায় ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত সম্পূর্ণ সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করা যাবে। ম্যাচ চলাকালীন বলটি যদি কোনো কারণে মাঠের বাইরে চলে যায়, তবে এর ভেতরের সেন্সরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘হাইবারনেশন মোডে’ বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় চলে যায়। স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তি সাশ্রয় করার এই বিশেষ গুণের কারণে বলের ব্যাটারির স্থায়িত্ব চার্জ না দেওয়া হলেও অনায়াসে কয়েক দিন পর্যন্ত বজায় থাকে।
তিন আয়োজক দেশের প্রতীকে বলের নকশা
উন্নত প্রযুক্তির পাশাপাশি ‘অ্যাডিডাস ট্রাইওন্ডা’ বলটির বাহ্যিক নকশা বা ডিজাইনেও তিন আয়োজক দেশের সংস্কৃতির বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আকর্ষণীয় লাল, সবুজ ও নীল রঙের সমন্বয়ে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বলটির অবয়ব। বলটিতে প্রতীকী রূপ হিসেবে স্থান পেয়েছে কানাডার জাতীয় প্রতীক ম্যাপল লিফ, মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী ঈগল এবং যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার তারকা চিহ্ন বা স্টার সিম্বল। মূলত এই তিন আয়োজক দেশের মেলবন্ধন এবং ‘তিন তরঙ্গ’ বা ‘থ্রি ওয়েভস’ ধারণা থেকেই এই বলটির নামকরণ করা হয়েছে ‘ট্রাইওন্ডা’।
প্রযুক্তির এই আধুনিক সংযোজন বৈশ্বিক ফুটবল বাজারেও সাধারণ ক্রেতা ও ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সাধারণ ফুটবল ভক্ত ও খেলোয়াড়দের সুবিধার্থে অ্যাডিডাস ট্রাইওন্ডা বলটি মোট চারটি ভিন্ন সংস্করণে বাজারে উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
চার ভিন্ন সংস্করণ ও দামের সমীকরণ
বাজারের চাহিদা মেটাতে বলটি মূলত চারটি পৃথক ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করা হয়েছে, যার মূল্যমানের তারতম্য রয়েছে প্রযুক্তিগত পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে। এই সংস্করণগুলো হলো যথাক্রমে—প্রো (Pro), কম্পিটিশন (Competition), লীগ (League) এবং ক্লাব (Club)। এর মধ্যে সর্বোচ্চ মানের ‘প্রো’ সংস্করণটিই সরাসরি বিশ্বকাপে অফিশিয়াল ম্যাচ বল হিসেবে মাঠের খেলায় ব্যবহৃত হবে। এই সংস্করণটিতেই কেবল মূল সেন্সর প্রযুক্তি এবং ফিফা কোয়ালিটি প্রো সার্টিফিকেশন যুক্ত করা হয়েছে।
অ্যাডিডাসের পক্ষ থেকে সংস্করণভেদে এই বলটির দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এই বলগুলোর মূল্য মানভেদে প্রায় ২৫ মার্কিন ডলার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৭০ মার্কিন ডলারের মধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রো (Pro) সংস্করণ: মাঠের মূল খেলায় ব্যবহৃত সর্বোচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন ও সেন্সরযুক্ত ‘প্রো’ সংস্করণের বলটির আনুমানিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫০ থেকে ১৭০ মার্কিন ডলার।
লীগ ও ক্লাব সংস্করণ: সাধারণ ফুটবলপ্রেমী ও সৌখিন ব্যবহারকারীদের জন্য তৈরি করা লীগ ও ক্লাব সংস্করণের বলগুলোর দাম রাখা হয়েছে মাত্র ২৫ থেকে ৬০ মার্কিন ডলারের মধ্যে। এর ফলে সাধারণ ফুটবল ভক্তরা সহজেই প্রযুক্তির এই নতুন ছোঁয়া উপভোগ করতে পারবেন।
