বিশ্বকাপ ২০২৬-এর জন্য বিভিন্ন দেশের চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণার প্রক্রিয়া চলমান থাকায় আন্তর্জাতিক ফুটবলে ব্রাজিলের ঘরোয়া লিগ নিয়ে একটি নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া বিভিন্ন জাতীয় দলের মোট ৩২ জন ফুটবলার ব্রাজিলের শীর্ষ লিগে খেলে থাকেন বা খেলছেন। এর মাধ্যমে দেশটির ঘরোয়া ফুটবল ৫২ বছর আগের পূর্ববর্তী রেকর্ডকে অতিক্রম করেছে।
এর আগে একক বিশ্বকাপে ব্রাজিলের শীর্ষ লিগ থেকে সর্বাধিক ২৭ জন ফুটবলার অংশ নিয়েছিলেন ১৯৭৪ সালে। এরপর ১৯৮৬ বিশ্বকাপে সেই সংখ্যা ছিল ২৫ জন। তুলনামূলকভাবে ২০২২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে মাত্র ৭ জন ফুটবলার জাতীয় দলগুলোর স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছিলেন। মাত্র চার বছরের ব্যবধানে সেই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৩২-এ পৌঁছানোকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ব্রাজিলের ফুটবলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ক্লাবগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং ঘরোয়া ফুটবল কাঠামোর আধুনিকায়ন। টেলিভিশন সম্প্রচার স্বত্ব থেকে আয়ের বৃদ্ধি এবং স্পনসরশিপ খাতের সম্প্রসারণও ক্লাবগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
ক্রীড়া অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ মোইসেস আসায়াগ উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের প্রথম ট্রান্সফার পর্ব থেকেই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সূচনা হয়। তার মতে, ক্লাব ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ প্রবাহের কারণে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে।
বর্তমানে ব্রাজিলকে দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী ফুটবল বাজার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই অঞ্চলীয় প্রভাবের দিক থেকে ব্রাজিলিয়ান শীর্ষ লিগ ইউরোপের ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের মতো অবস্থানে পৌঁছেছে।
অ্যাথলেট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মার্কোস কাসেব বলেন, ব্রাজিল এখন এমন একটি বাজারে পরিণত হয়েছে যেখানে খেলোয়াড়দের বিকাশ, পরিচিতি এবং পরবর্তী বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়। তার মতে, দক্ষিণ আমেরিকায় ব্রাজিলের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ তুলনামূলকভাবে কম।
শুধু তরুণ প্রতিভা নয়, ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত অনেক খেলোয়াড়ও এখন ব্রাজিলের লিগে ফিরে আসছেন। চলতি মৌসুমে ফ্ল্যামেঙ্গো লুকাস পাকেতাকে প্রায় চার কোটি বিশ লাখ ইউরো ব্যয়ে দলে অন্তর্ভুক্ত করেছে। পালমেইরাস ভিতর রোকেকে প্রায় দুই কোটি পঞ্চান্ন লাখ ইউরোতে দলে নিয়েছে। এছাড়া ক্রুজেইরো গেরসনকে এবং বোটাফোগো দানিলো সান্তোসকে দলে যুক্ত করেছে।
বিদেশি খেলোয়াড়দের আগমনও লিগের প্রতিযোগিতার মান বাড়িয়েছে। নিকোলাস দে লা ক্রুস, রামন সোসা, গনসালো প্লাতা এবং মেমফিস ডেপাইয়ের মতো খেলোয়াড়রা বর্তমানে তাদের নিজ নিজ জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছেন।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি খেলোয়াড় পাঠিয়েছে ফ্ল্যামেঙ্গো ক্লাব, যেখান থেকে নয়জন ফুটবলার বিভিন্ন দেশের স্কোয়াডে রয়েছেন। পালমেইরাস থেকে সাতজন, অ্যাতলেতিকো মিনেইরো থেকে চারজন এবং গ্রেমিও ও ইন্টারনাসিওনাল থেকে দুইজন করে খেলোয়াড় বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছেন।
নিচে প্রধান ক্লাবভিত্তিক খেলোয়াড় প্রতিনিধিত্বের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র দেওয়া হলো—
| ক্লাবের নাম | বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া খেলোয়াড় সংখ্যা |
|---|---|
| ফ্ল্যামেঙ্গো | ৯ জন |
| পালমেইরাস | ৭ জন |
| অ্যাতলেতিকো মিনেইরো | ৪ জন |
| গ্রেমিও | ২ জন |
| ইন্টারনাসিওনাল | ২ জন |
ব্রাজিল জাতীয় দলের তারকা নেইমার, লুকাস পাকেতা, লিও পেরেইরা, দানিলো এবং আলেক্স সান্দ্রোর মতো খেলোয়াড়রাও এখন ঘরোয়া লিগ থেকেই বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছেন। এর ফলে দীর্ঘ সময় পর ব্রাজিলের শীর্ষ লিগ আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় মঞ্চে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে।
ফুটবল এজেন্ট ক্লদিও ফিওরিতোর মতে, বর্তমানে ব্রাজিলিয়ান লিগে খেলা মানে জাতীয় দলের নির্বাচনের আরও কাছাকাছি থাকা। তার মতে, লিগটি আবারও ফুটবলারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনী মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ ২০২৬-এর স্কোয়াডে ব্রাজিলিয়ান লিগ থেকে রেকর্ড সংখ্যক ফুটবলার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলে এই লিগের প্রভাব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে।
