খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই জুলাই ২০২৬, ২:৫৬ পিএম

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার বারইপুরে ১২ বছর বয়সী এক কন্যাশিশুকে অপহরণের পর ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় মূল অভিযুক্তসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নৃশংস এই অপরাধকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় তীব্র জনরোষ, বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে জেলা পুলিশ ইতিমধ্যেই একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠন করেছে।
তদন্তকারীদের সূত্রে জানা গেছে, সোমবার ভোরে বারইপুর এলাকা থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার সময় প্রধান অভিযুক্ত আনন্দ সর্দারকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এর আগে এই মামলায় প্রভাস মণ্ডল ও দিবাকর সর্দার নামে আরও দুজনকে আটক করা হয়েছিল। পুলিশ জানিয়েছে, প্রভাস মণ্ডলকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মূল অভিযুক্ত আনন্দ সর্দার এবং দিবাকর সর্দারের অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এরপরই পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করে।
এই মর্মান্তিক ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল গত শনিবার বিকেলে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বারইপুর থানার ধপধপি এলাকার সূর্যপুর হাটের বাসিন্দা ওই ১২ বছরের শিশুটি তার এক বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়। অভিযোগ উঠেছে, পথিমধ্যে স্থানীয় কয়েকজন তরুণ তাকে জোরপূর্বক অপহরণ করে নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও মেয়েটির কোনো খোঁজ না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং বারইপুর থানায় একটি নিখোঁজের ডায়েরি করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ অনুসন্ধান শুরু করলেও প্রথমদিকে শিশুটির কোনো হদিস মেলাতে পারেনি।
পরদিন রবিবার ভোরে শিশুটির বাড়ির কাছের একটি পুকুরে একটি সন্দেহভাজন বস্তা ভাসতে দেখেন স্থানীয়রা। পরে সেখান থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় ওই শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ সামনে আসায় মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকায় শোক ও ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই হাজার হাজার স্থানীয় বাসিন্দা রাস্তায় নেমে আসেন। তাঁরা শিশুটির মরদেহ সড়কের ওপর রেখে দীর্ঘক্ষণ অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। শুধু সড়কপথই নয়, সংলগ্ন রেলপথও অবরোধ করা হয়, যার ফলে শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার ট্রেন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। উত্তেজিত জনতা দোষীদের দ্রুত বিচার ও ফাঁসির দাবি জানাতে থাকেন।
ক্রমেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী ও র্যাফ মোতায়েন করা হয়। সম্ভাব্য বড় ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ও দাঙ্গা এড়াতে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা পুলিশ প্রশাসন বারইপুর, সোনারপুর ও নরেন্দ্রপুর থানা এলাকায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে চার বা ততোধিক মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার শান্তি বজায় রাখার মাইকিং করা হলেও ক্ষুব্ধ জনতার বিক্ষোভ দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে।
ঘটনার তদন্তে গতি আনতে এবং নির্ভুল প্রমাণ জোগাড় করতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা এসআইটি গঠন করেছে জেলা পুলিশ। তদন্তকারীরা ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছেন। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করে পুরো ঘটনার ধারাবাহিকতা ও অপরাধের পেছনের উদ্দেশ্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই জঘন্য অপরাধের সঙ্গে আর কেউ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকলে তাকেও কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
এদিকে এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনেও তোলপাড় শুরু হয়েছে। শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা ও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সাবেক স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলটির নেত্রী দোলা সেনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরও এই ঘটনায় সরব হয়েছে। সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী এবং শমীক লাহিড়ীর নেতৃত্বে আরেকটি বাম প্রতিনিধিদলও নিহত শিশুর বাড়ি পরিদর্শন করে। তাঁরা পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে একটি নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান।
উত্তেজনার রেশ ধরে রবিবার এক চরম আইন অমান্যের ঘটনাও ঘটে। বারইপুরজুড়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ চলাকালে বিক্ষুব্ধ জনতা সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে চোর বা অপরাধী সন্দেহে ধরে ফেলে। এরপর উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়। পুলিশ জানিয়েছে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই ঘটনাটিকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে একটি পৃথক মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করা হয়েছে।
বারইপুরের এই ঘটনা শুধু স্থানীয় মানুষকেই নয়, গোটা পশ্চিমবঙ্গকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এক অবুঝ শিশুর এমন নির্মম ও পৈশাচিক মৃত্যুর ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম নিয়েছে। তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে বিচার নিশ্চিত করার দাবি এখন সব মহল থেকে উঠছে। একই সঙ্গে সমাজে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং নিখোঁজের অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের আরও তৎপর হওয়ার বিষয়টিও এই ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে।
মন্তব্য