খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ই জুন ২০২৬, ১০:৪৩ পিএম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার বিশ্বজুড়ে আর্থিক খাতের চিত্র বদলে দিচ্ছে। এর বাইরে নয় ভারতের বীমা শিল্পও। গ্রাহকসেবা থেকে শুরু করে দাবি নিষ্পত্তি, ঝুঁকি মূল্যায়ন, প্রতারণা শনাক্তকরণ এবং তথ্য বিশ্লেষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে দ্রুত বাড়ছে এআইয়ের ব্যবহার। তবে প্রযুক্তিটির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে তথ্য নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে বীমা খাতে এআই ব্যবহারের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি মূল্যায়নে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে ভারতের বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্স্যুরেন্স রেগুলেটরি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি অব ইন্ডিয়া (আইআরডিএআই)।
সংস্থাটি এআই-সংক্রান্ত বিষয়গুলো পর্যালোচনার জন্য সাত সদস্যের একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করেছে। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইআইআইটি) হায়দরাবাদের পরিচালক অধ্যাপক সন্দীপ কে. শুক্লা।
আইআরডিএআই জানিয়েছে, ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রধান দায়িত্ব হবে বীমা শিল্পে এআই প্রযুক্তির বর্তমান ব্যবহার, এর প্রভাব এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা। একই সঙ্গে বীমা কোম্পানি, পলিসিধারক এবং সামগ্রিক বীমা ব্যবস্থার ওপর প্রযুক্তিটির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও মূল্যায়ন করা হবে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে এমন ঝুঁকিগুলোর ওপর, যেগুলো ভবিষ্যতে শিল্পটির স্থিতিশীলতা ও গ্রাহক সুরক্ষার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
ওয়ার্কিং গ্রুপটি উন্নত বা ‘ফ্রন্টিয়ার এআই’ প্রযুক্তির প্রভাবও পর্যালোচনা করবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও শক্তিশালী এআই মডেলের ব্যবহার বাড়ার ফলে স্বয়ংক্রিয় সাইবার হামলা, তথ্য চুরি, পরিচয় জালিয়াতি এবং অ্যালগরিদমভিত্তিক অপব্যবহারের আশঙ্কা বেড়েছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত, সে বিষয়ে সুপারিশ তৈরির দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে দলটিকে।
এ ছাড়া বীমা খাতে ব্যবহৃত এআইভিত্তিক ব্যবস্থাগুলোর সক্ষমতা যাচাইয়ে শিল্পব্যাপী ‘স্ট্রেস টেস্ট’ প্রয়োজন কি না, তাও খতিয়ে দেখা হবে। কোনো সংকটময় পরিস্থিতি বা অস্বাভাবিক ঘটনার সময় এআইনির্ভর সিস্টেম কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, তা মূল্যায়নের জন্য এমন পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
পর্যালোচনার অংশ হিসেবে বিভিন্ন বীমা প্রতিষ্ঠানে এআই প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা, ব্যবহারিক পরিপক্বতা, বাস্তবায়নের ধরণ এবং বিদ্যমান পরিচালনব্যবস্থা বিশ্লেষণ করা হবে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে যেসব এআই সিস্টেম ব্যবহার করছে, সেগুলোর কাঠামো, কার্যকারিতা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও মূল্যায়ন করা হবে।
এই কাজের ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ এআই গভর্ন্যান্স কাঠামো তৈরির সুপারিশ করবে ওয়ার্কিং গ্রুপ। প্রস্তাবিত কাঠামোর লক্ষ্য হবে এআই প্রযুক্তির নৈতিক, স্বচ্ছ এবং ব্যাখ্যাযোগ্য ব্যবহার নিশ্চিত করা। অর্থাৎ কোনো এআইভিত্তিক সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হচ্ছে, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা যেন প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং গ্রাহক—সব পক্ষই বুঝতে পারে।
আইআরডিএআইয়ের পরিকল্পিত নীতিমালায় দাবি ব্যবস্থাপনা, প্রতারণা প্রতিরোধ, ঝুঁকি নিরূপণ, গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বিশেষ করে গ্রাহকের তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি নীতিমালার অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই প্রযুক্তি বীমা খাতের দক্ষতা ও সেবার মান বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ছাড়া এর ব্যবহার বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত, তথ্য অপব্যবহার কিংবা সাইবার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা এবং শিল্পের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই ভারতের এই উদ্যোগকে বীমা খাতের ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মন্তব্য