খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুলাই ২০২৬, ৫:৩২ পিএম

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আসন্ন দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজকে কেবল জয়-পরাজয়ের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন। তাঁর চোখে এই সফরের বড় লক্ষ্য হলো প্রতিটি ম্যাচে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলা, নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দেওয়া এবং শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলা। ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ক্রিকেটের মান কতটা উঁচুতে নেওয়া যায়, সেটিও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে তাঁর ভাবনায়।
সিরিজ শুরুর আগে মিরপুরে সংবাদ সম্মেলনে নাজমুলের কথাবার্তায় সেই প্রত্যাশাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরুর আগেই তিনি সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই ম্যাচের সিরিজ নিয়ে তাঁদের প্রত্যাশা কী। একজন সাংবাদিকের কাছ থেকে ‘ভালো খেলা’ উত্তর শুনে অধিনায়ক মজা করে পাল্টা প্রশ্ন করেন, তিনি নিজে এমন কথা বললে সেটি সাংবাদিকদের পছন্দ হতো কি না। পরে আরেক সাংবাদিক প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশারের মন্তব্য তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশ ‘সম্মান নিয়ে ফিরতে’ চায়। এই বক্তব্যটিই নাজমুলের কাছে বেশি পছন্দের বলে মনে হয়।
তবে ‘সম্মান’ শব্দটিকে কোনোভাবেই আত্মসমর্পণের মানসিকতা হিসেবে দেখছেন না বাংলাদেশ অধিনায়ক। বরং তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল লড়াই করার প্রত্যয়। প্রতিটি ম্যাচ জয়ের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামতে চায় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে নিজেদের পরিকল্পনা কতটা কার্যকর করা যায় এবং স্বাগতিকদের কতটা চাপে রাখা সম্ভব হয়, সেটিও হবে দলের পারফরম্যান্স বিচারের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
নাজমুলের ভাবনায় এই সিরিজের প্রভাব দুই ম্যাচের ফলাফলের চেয়েও অনেক বিস্তৃত। অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তাদের নিজেদের মাটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলতে পারলে বাংলাদেশের টেস্ট দলের আত্মবিশ্বাস যেমন বাড়বে, তেমনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দলের ভাবমূর্তিও আরও শক্তিশালী হতে পারে। ভবিষ্যতে বড় দলগুলোর বিপক্ষে নিয়মিত টেস্ট খেলার সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রেও এমন পারফরম্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এবারের সফরের বিশেষত্ব আরও বেশি, কারণ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। প্রায় ২৩ বছর পর আবারও অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলেছিল দলটি। এরপর দুই দেশের টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘ বিরতি তৈরি হয়। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের ক্রিকেটে একাধিক প্রজন্ম এসেছে এবং বিদায় নিয়েছে। অনেক ক্রিকেটার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে সাফল্য পেলেও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাননি।
অভিজ্ঞ ব্যাটার মুশফিকুর রহিমের ক্যারিয়ারও এই দীর্ঘ অপেক্ষার অন্যতম প্রতীক। দুই দশকের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে থাকা এবং শতাধিক টেস্ট খেলা এই ক্রিকেটারও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগ পাননি। ফলে এবারের সফর তাঁর মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের জন্য যেমন বিশেষ, তেমনি তরুণ ক্রিকেটারদের কাছেও এটি নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের বড় মঞ্চ।
সিরিজটি বাংলাদেশের জন্য কঠিন হবে—এ নিয়ে কোনো সংশয় নেই। অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব কন্ডিশন, পেস সহায়ক পরিবেশ, স্বাগতিকদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং ঘরের মাঠে তাদের স্বাভাবিক আধিপত্য—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। বিদেশের মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে সাফল্য পেতে হলে ব্যাটিংয়ে দীর্ঘ সময় টিকে থাকা, নতুন বল সামলানো এবং বোলারদের ধারাবাহিকভাবে চাপ তৈরি করার মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশকে নিজেদের সেরা ক্রিকেট খেলতে হবে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে যে পরিবর্তন এসেছে, সেটিই নাজমুলদের আশাবাদী করে তুলছে। দেশের বাইরে বিভিন্ন সময়ে দল প্রতিদ্বন্দ্বিতার সামর্থ্য দেখিয়েছে। নিজেদের মাঠেও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ভালো ফল করার নজির রয়েছে। ফলে এখন বাংলাদেশের সমর্থকদের প্রত্যাশাও আগের চেয়ে অনেক বেশি।
নাজমুলের দৃষ্টিতে সমর্থকদের এই পরিবর্তিত প্রত্যাশা আসলে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের অগ্রগতিরই প্রতিফলন। একসময় বড় দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় থাকলেও এখন পরিস্থিতি বদলেছে। প্রতিপক্ষ যত শক্তিশালীই হোক, বাংলাদেশ জিততে পারে—দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে এমন বিশ্বাস তৈরি হয়েছে। অধিনায়কের কাছে এই প্রত্যাশা চাপের পাশাপাশি অনুপ্রেরণারও উৎস।
অস্ট্রেলিয়া সিরিজে সেই বিশ্বাসের বাস্তব পরীক্ষা হবে। দুই ম্যাচের সিরিজ হওয়ায় প্রতিটি সেশন, প্রতিটি উইকেট এবং প্রতিটি রানই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘ সিরিজে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকলেও দুই ম্যাচের লড়াইয়ে শুরু থেকেই ভালো অবস্থান তৈরি করা জরুরি। একটি ম্যাচে সামান্য ভুলও ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
বাংলাদেশ তাই শুধু ফলাফলের দিকে তাকিয়ে নেই। তাদের লক্ষ্য প্রতিটি ম্যাচে নিজেদের ক্রিকেটের মান তুলে ধরা এবং অস্ট্রেলিয়াকে কোনো পর্যায়েই স্বস্তিতে থাকতে না দেওয়া। ব্যাটিং, বোলিং কিংবা ফিল্ডিং—প্রতিটি বিভাগে ধারাবাহিকতা ধরে রেখে লড়াই চালিয়ে যাওয়াই হবে দলের বড় চ্যালেঞ্জ।
শেষ পর্যন্ত সিরিজের ফল বাংলাদেশকে জয় এনে দেবে কি না, তা সময়ই বলবে। কিন্তু নাজমুল হোসেনের বক্তব্যে পরিষ্কার, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ কেবল অংশ নিতে যাচ্ছে না; তারা নিজেদের অবস্থান জানান দিতে চায়। প্রতিটি ম্যাচে জয়ের লক্ষ্য থাকবে, তবে সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট এবং সম্মানজনক পারফরম্যান্সই হবে মূল পরিচয়। দীর্ঘ ২৩ বছরের অপেক্ষার পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এই প্রত্যাবর্তন তাই বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের জন্য শুধু একটি সিরিজ নয়, বরং নিজেদের সামর্থ্য নতুন করে প্রমাণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
মন্তব্য