খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুলাই ২০২৬, ৫:২৪ পিএম

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি তামিম ইকবাল ভারত সফরে যাচ্ছেন। সফরসঙ্গী হিসেবে তাঁর সঙ্গে থাকবেন বিসিবির গ্রাউন্ডস ও হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) কমিটির চেয়ারম্যান শাহনিয়ান তানিম। বেঙ্গালুরুতে ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের (বিসিসিআই) আধুনিক সেন্টার অব এক্সিলেন্স পরিদর্শনই তাঁদের এই সফরের প্রধান উদ্দেশ্য। বাংলাদেশের ক্রিকেট অবকাঠামোকে আরও আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই সফরকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিসিবির পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজধানীর পূর্বাচলে একটি বিশ্বমানের ক্রিকেট এক্সিলেন্স সেন্টার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সফলভাবে পরিচালিত একটি আধুনিক ক্রিকেট উন্নয়নকেন্দ্র সরেজমিনে পরিদর্শন করে অভিজ্ঞতা নেওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে বোর্ড। সে কারণেই বেঙ্গালুরুর সেন্টার অব এক্সিলেন্সকে সফরের গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।
আধুনিক ক্রিকেটে শুধু মাঠে নিয়মিত অনুশীলন করলেই একজন খেলোয়াড়ের পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। খেলোয়াড়ের শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক প্রস্তুতি, কারিগরি দক্ষতা, চোট প্রতিরোধ, পুনর্বাসন এবং পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত অবকাঠামো। বেঙ্গালুরুর সেন্টার অব এক্সিলেন্সে এমন বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে, যেখানে ক্রিকেট প্রশিক্ষণের সঙ্গে স্পোর্টস সায়েন্স, বায়োমেকানিক্স, ফিটনেস ও আধুনিক প্রযুক্তিকে একসঙ্গে কাজে লাগানো হয়।
তামিম ইকবাল ও শাহনিয়ান তানিমের সফরে এসব সুযোগ-সুবিধা সরেজমিনে দেখার পাশাপাশি খেলোয়াড় উন্নয়নের কাঠামো সম্পর্কেও ধারণা নেওয়ার সুযোগ থাকবে। বিশেষ করে অনুশীলন পদ্ধতি, ফিটনেস ব্যবস্থাপনা, চোটের ঝুঁকি কমানোর কৌশল, পুনর্বাসন প্রক্রিয়া এবং প্রযুক্তিনির্ভর পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ কীভাবে পরিচালিত হয়—এসব বিষয় বাংলাদেশের প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্য কার্যকর অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে।
পূর্বাচলে যে এক্সিলেন্স সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, সেটিকে কেবল জাতীয় দলের অনুশীলনকেন্দ্র হিসেবে দেখছে না বিসিবি। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের ক্রিকেট উন্নয়নের একটি কেন্দ্রীয় অবকাঠামো হয়ে উঠতে পারে। জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের পাশাপাশি ‘এ’ দল, এইচপি ইউনিট এবং বয়সভিত্তিক পর্যায়ের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের উন্নয়ন কার্যক্রমও একই কাঠামোর আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের একটি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র চালু হলে খেলোয়াড়দের দক্ষতা মূল্যায়ন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরও ধারাবাহিকতা আসতে পারে। বায়োমেকানিক্সের মাধ্যমে বোলিং বা ব্যাটিংয়ের কারিগরি ত্রুটি চিহ্নিত করা, স্পোর্টস সায়েন্সের সহায়তায় শারীরিক সক্ষমতা পরিমাপ করা এবং তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে অনুশীলনের পরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে চোটের ধরন ও ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করে খেলোয়াড়দের কর্মক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার ক্ষেত্রেও সহায়তা মিলতে পারে।
পূর্বাচল স্টেডিয়াম প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক্সিলেন্স সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনাও সম্প্রতি বিসিবির বোর্ড সভায় অনুমোদন পেয়েছে। বুধবার অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভা শেষে বোর্ড সভাপতি দ্রুত কাজ শুরুর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ফলে বেঙ্গালুরু সফরকে প্রকল্পটির বাস্তব রূপরেখা তৈরির প্রস্তুতিপর্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই ক্রিকেট অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিভাবান ক্রিকেটার উঠে এলেও তাঁদের অনেকের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত। বিশেষ করে উচ্চমানের ফিটনেস সুবিধা, চোট-পরবর্তী পুনর্বাসন, দক্ষতা বিশ্লেষণ এবং বয়সভিত্তিক খেলোয়াড়দের পরিকল্পিত উন্নয়নে আরও বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। পূর্বাচলের প্রস্তাবিত এক্সিলেন্স সেন্টার সেই ঘাটতি পূরণের একটি বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তামিমের ভারত সফরে ক্রিকেট অবকাঠামোর পাশাপাশি দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলতে ভারতীয় দলের সফরের কথা রয়েছে। সফরের সময় দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তাদের মধ্যে সম্ভাব্য সিরিজের সূচি, প্রস্তুতি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় নিয়ে মতবিনিময় হতে পারে।
তবে এই সফরের মূল গুরুত্ব থাকবে ক্রিকেট অবকাঠামো উন্নয়নের অভিজ্ঞতা অর্জনে। বেঙ্গালুরুর সেন্টার অব এক্সিলেন্স ঘুরে দেখে বিসিবি বুঝতে পারবে, একটি আধুনিক ক্রিকেট উন্নয়নকেন্দ্র পরিচালনার জন্য কী ধরনের অবকাঠামো, প্রযুক্তি, জনবল ও প্রশিক্ষণব্যবস্থা প্রয়োজন। সেই অভিজ্ঞতা পূর্বাচলের প্রকল্পের নকশা ও কার্যক্রম নির্ধারণে কাজে লাগতে পারে।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই বাস্তবতায় তামিম ইকবালের ভারত সফরকে নিছক একটি আনুষ্ঠানিক পরিদর্শন হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং পূর্বাচলে পরিকল্পিত ক্রিকেট এক্সিলেন্স সেন্টারকে আন্তর্জাতিক মানে গড়ে তোলার প্রস্তুতিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দীর্ঘমেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের ক্রিকেটার তৈরির প্রক্রিয়া, খেলোয়াড়দের বৈজ্ঞানিক পরিচর্যা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।
মন্তব্য