জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুলাই ২০২৬, ৭:৩৪ পিএম

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। তাঁর অভিযোগ, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম একপাক্ষিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এবং এর মাধ্যমে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাকসু কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে জাহিদ দাবি করেন, সাম্প্রতিক মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন রাকসু পর্যবেক্ষণ করছে। যেসব প্রতিবেদনে তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী ছাত্রলীগকে ‘ডিফেন্ড’ করা হয়েছে, সেগুলো সংগ্রহ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে এসব প্রতিবেদন প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন রাকসু ভিপি।
তবে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। একটি ঘটনার সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ থাকা জরুরি। একইভাবে কোনো প্রতিবেদনে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ প্রতিবাদ জানানো কিংবা প্রচলিত আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিকার চাওয়া। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি সেই প্রক্রিয়ার পরিবর্তে চাপ তৈরির আশঙ্কা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাম্প্রতিক মারধরের ঘটনাকে সংবাদমাধ্যমে ‘হামলা’ হিসেবে বর্ণনা করার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছেন জাহিদ। তাঁর বক্তব্য, শিক্ষার্থীরা কোনো পক্ষের ওপর বিনা উসকানিতে হামলা চালায়নি; বরং প্রতিপক্ষের হামলার জবাবে তারা ‘প্রতিরোধ’ করেছে। এ কারণে সংবাদ প্রতিবেদনে ‘হামলা’ শব্দের পরিবর্তে ‘প্রতিরোধ’ শব্দ ব্যবহার করা উচিত বলে মত দেন তিনি।
রাকসু ভিপির বক্তব্যে ঘটনাটির ভাষ্য ও সংবাদ পরিবেশনের ধরন নিয়ে সংগঠনটির সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। জাহিদের দাবি, কোনো সংঘর্ষের পেছনের প্রেক্ষাপট, ঘটনার সূত্রপাত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা বিবেচনায় না নিয়ে শুধু মারধরের অংশ তুলে ধরা হলে পুরো ঘটনা একপাক্ষিকভাবে প্রকাশিত হতে পারে। তাঁর মতে, ঘটনার আগে কী ঘটেছিল এবং কারা কী ভূমিকা পালন করেছে, সেটিও প্রতিবেদনে গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে, সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো সংঘর্ষ বা মারধরের ঘটনাকে ‘হামলা’ নাকি ‘প্রতিরোধ’ বলা হবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষদর্শী, ভুক্তভোগী, অভিযুক্ত এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। ঘটনার প্রকৃতি সম্পর্কে পুলিশ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও সংবাদ প্রতিবেদনে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহারের আগে তথ্য-প্রমাণ ও ঘটনার ধারাবাহিকতা বিবেচনা করাই সাংবাদিকতার স্বাভাবিক নীতি।
সংবাদ সম্মেলনে জাহিদ কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়া এবং পাঠদানে বিঘ্ন ঘটানোর অভিযোগও অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, লাইব্রেরির সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন সাধারণ শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে আয়োজিত হয়নি; বরং এটি ছাত্রদলের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষের বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনে পাওয়া যায়নি।
এর আগে রাকসু ভবনে ঘটে যাওয়া একটি হামলার ঘটনাকে সংবাদমাধ্যম যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি বলেও অভিযোগ করেন জাহিদ। তাঁর ভাষ্য, ওই ঘটনায় একজনকে মারধর করা হয়েছিল এবং আরও দুজন আক্রান্ত হন। তাঁদের মধ্যে একজন রক্তাক্তও হয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। রাকসু ভিপির অভিযোগ, ওই ঘটনার তুলনায় সাম্প্রতিক মারধরের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আগের দিনের ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এক প্রশ্নের জবাবে জাহিদ বলেন, ওই ঘটনার কেন্দ্রীয় ব্যক্তি আনাস ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে রাকসুর বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ওই ঘটনায় ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে রাকসু—এমন কথাও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মারও বক্তব্য দেন। সংবাদ পরিবেশনে ব্যবহৃত শব্দের প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি শব্দ মানুষের কাছে কারও ভাবমূর্তি তৈরি করতে পারে, আবার একই শব্দের ব্যবহারে সেই ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে। রাকসু যে ঘটনাকে ‘প্রতিরোধ’ হিসেবে দেখছে, সংবাদমাধ্যম সেটিকে একইভাবে দেখতে পারছে না কেন—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
এদিকে সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ক্যাম্পাসে সাম্প্রতিক সহিংসতা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে রাকসুর উদ্বেগও সামনে এসেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে ছয় দফা দাবি জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এক নারী শিক্ষার্থীকে প্রাণনাশের হুমকির ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া, রাকসু ভবন ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করে বিচার নিশ্চিত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কথিত নিষ্ক্রিয়তার তদন্ত করা।
রাকসুর অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে ক্যাম্পাসে সহিংসতা ও রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অতীতে নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ও ছাত্রলীগ-সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে ঘিরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। একদিকে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অন্যদিকে, সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ, মারধর বা রাজনৈতিক বিরোধের মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় সত্য উদ্ঘাটনের জন্য সব পক্ষের বক্তব্য যাচাই, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য সংগ্রহ এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশ জরুরি।
একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শনাক্ত করা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার। ক্যাম্পাসে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মতপ্রকাশ ও সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থা, স্বচ্ছ তদন্ত এবং দায়িত্বশীল আচরণই পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
মন্তব্য