জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুলাই ২০২৬, ৭:২৯ পিএম

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মার এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের কয়েকজন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অভিযোগে উদ্বেগ জানিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় মারধর, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে হেনস্তা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সংগঠনটি এ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
গত বুধবার বিকেলে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে শিক্ষক নেটওয়ার্ক এসব অভিযোগ তুলে ধরে। একই সঙ্গে বিবৃতির একটি অনুলিপি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত সোমবার রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে তিন শিক্ষার্থীকে একাধিকবার মারধরের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষক নেটওয়ার্কের দাবি, ওই ঘটনায় আহত দুই শিক্ষার্থীকে পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সালাউদ্দিন আম্মার, সংশ্লিষ্ট ছাত্রশিবির নেতা-কর্মী কিংবা পুলিশের পৃথক বক্তব্য বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের ভাষ্য, ঘটনাটিকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ক্যাম্পাস-সহিংসতা হিসেবে দেখলে বিষয়টির গুরুত্ব খাটো করে দেখা হবে। তাদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তর, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার এবং এমনকি অ্যাম্বুলেন্স থেকে আহত ব্যক্তিকে নামিয়ে মারধরের মতো ঘটনা ঘটে থাকলে তা ক্যাম্পাসের নিরাপত্তাব্যবস্থা, শিক্ষার পরিবেশ এবং আইনের শাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
সংগঠনটি মনে করে, কোনো শিক্ষার্থী বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ উঠলে তার তদন্ত ও বিচার করার দায়িত্ব ছাত্রসংগঠন, রাজনৈতিক গোষ্ঠী কিংবা কোনো ব্যক্তির নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার। কেউ যদি নিজ উদ্যোগে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করেন, তা আইনের শাসনের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমন প্রবণতা চলতে থাকলে ক্যাম্পাসে প্রতিশোধ, পাল্টাপাল্টি হামলা এবং অনিশ্চয়তার পরিবেশ আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
বিবৃতিতে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের ‘ট্যাগিং’ বা চিহ্নিত করে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং হেনস্তার অভিযোগও তোলা হয়েছে। শিক্ষক নেটওয়ার্কের দাবি, অতীতে যে ধরনের রাজনৈতিক ট্যাগিং, নির্যাতন ও হয়রানির সংস্কৃতির সমালোচনা করা হয়েছে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভিন্ন পরিচয় ও ভিন্ন পক্ষের মাধ্যমে একই ধরনের প্রবণতা ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, রাজনৈতিক মতাদর্শ বা সাংগঠনিক পরিচয় কোনো শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার পাওয়ার পথে বাধা হওয়া উচিত নয়।
রাকসুর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে শিক্ষক নেটওয়ার্ক। সংগঠনটির মতে, রাকসু শিক্ষার্থীদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করা, তাদের সমস্যা তুলে ধরা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর রাকসুর জিএস এবং তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের বিবৃতিতে এসব অভিযোগের উদাহরণ হিসেবে উসকানিমূলক বক্তব্য, প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও, আওয়ামীপন্থী হিসেবে পরিচিত শিক্ষক-কর্মকর্তাদের হেনস্তা এবং উপাচার্যের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া লাঠি হাতে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা, পোষ্য কোটা আন্দোলনের সময় তৎকালীন সহ-উপাচার্যকে হেনস্তা এবং প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার-এর কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় রাকসুর জিএস ও ভিপির উসকানিমূলক ভূমিকার অভিযোগও বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে শিক্ষক নেটওয়ার্কের বিবৃতিতে উত্থাপিত প্রতিটি অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করা হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয় মূলত জ্ঞানচর্চা, মুক্তবুদ্ধি ও মতপ্রকাশের একটি প্রতিষ্ঠান। সেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য, সাংগঠনিক পরিচয় কিংবা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কারণে শারীরিক নির্যাতন, অপমান, ভয়ভীতি বা দলবদ্ধভাবে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগ থাকলে তার যথাযথ তদন্ত করতে হবে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
সংগঠনটি আরও বলেছে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে যিনি অভিযোগ করেছেন বা যিনি কোনো ঘটনার শিকার হয়েছেন, তাঁর নিরাপত্তা ও মর্যাদাও নিশ্চিত করা জরুরি। অর্থাৎ, কোনো পক্ষের প্রতি রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়, বরং নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ওপর ভিত্তি করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেটওয়ার্ক এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান বিধি অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি কোনো ছাত্রসংগঠন, রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা প্রভাবশালী ব্যক্তি যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে শিক্ষক নেটওয়ার্কের এই বিবৃতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা এবং ছাত্ররাজনীতির সীমা ও দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট করতে হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়াই পারে ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আনতে এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে।
মন্তব্য