খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ই জুন ২০২৬, ১১:২৩ পিএম

বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং একের পর এক আঞ্চলিক সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এখন বড়সড় হুমকির মুখে। এমন এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে রাশিয়ার পক্ষ থেকে বিশ্ব নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ক্রেমলিনের দাবি, বর্তমান বিশ্বে যে তীব্র উত্তেজনা চলছে, তার মধ্যে কেবল পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার কারণেই একটি বড় ধরনের বৈশ্বিক যুদ্ধ বা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে। মস্কোয় অনুষ্ঠিত ১২তম আন্তর্জাতিক প্রিমাকভ রিডিংস ফোরামে অংশ নিয়ে রাশিয়ার এই নীতিগত অবস্থানের কথা জানান ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে পেসকভ সরাসরি উল্লেখ করেন, বর্তমান বাস্তবতায় পারমাণবিক সক্ষমতা ছাড়া পৃথিবীতে বড় কোনো সংঘাত রুখে দেওয়ার মতো আর কোনো শক্তিশালী বিকল্প অবশিষ্ট নেই। এই বিশেষ সামরিক দেওয়াল বা ভারসাম্যই বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোকে একটি সর্বাত্মক ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত রাখছে। তবে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও মনে করিয়ে দেন। এই পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা বড় যুদ্ধ রুখতে পারলেও বিভিন্ন অঞ্চলের ছোটখাটো বা আঞ্চলিক সংঘাত ঠেকানোর কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারে না। আর ঠিক এই কারণেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে, যা পুরো বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ক্রেমলিনের এই মুখপাত্র ভবিষ্যতের যুদ্ধকৌশল এবং প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে বিশ্ববাসীকে এক ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে ভবিষ্যতে এমন কিছু নতুন ধরনের অ-পারমাণবিক বা প্রথাগত অস্ত্রব্যবস্থা তৈরি হতে যাচ্ছে, যেগুলোর ধ্বংসক্ষমতা হবে হুবহু পারমাণবিক অস্ত্রের সমতুল্য। প্রথাগত অস্ত্রেরই যদি এমন ভয়াবহ রূপ তৈরি হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দেবে। এ কারণে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে এখনই এই ক্রমবর্ধমান সামরিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা নিয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তবে এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেও শান্তি প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে মস্কো। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম) এবং বিভিন্ন অঞ্চলের চলমান সংঘাত বন্ধে মধ্যস্থতাকারীদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ভূয়সী প্রশংসা করেন দিমিত্রি পেসকভ। তিনি স্পষ্ট করে জানান, রাশিয়া সবসময় এই ধরনের ইতিবাচক এবং বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক সমঝোতার উদ্যোগগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করে।
ফোরামের উদ্বোধনী অধিবেশনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এক বিশেষ বার্তা পাঠান। তাঁর সেই বার্তার সূত্র ধরে প্রিমাকভ রিডিংস ফোরামে রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তিগুলো আবারও বিশ্বমঞ্চে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। পুতিন তাঁর বার্তায় জোর দিয়ে বলেন, রাশিয়া আন্তর্জাতিক আইনের সর্বজনীন ও বাধ্যতামূলক নীতিমালা বজায় রাখতে সবসময় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এই লক্ষ্যে তারা কাজ করে যাবে।
একই সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অবিসংবাদিত কর্তৃত্ব রক্ষা করা, স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্মানবোধ নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ নিজে বেছে নেওয়ার অধিকারের প্রতি মস্কো তাদের জোরালো সমর্থন অব্যাহত রাখবে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ‘তাস’ এবং চীনের ‘সিনহুয়া’র প্রতিবেদন থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রেমলিনের এই নতুন অবস্থানের বিষয়টি বিস্তারিত জানা গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাশিয়ার এই বক্তব্য মূলত বর্তমানের একমেরু বিশ্বব্যবস্থার বিপরীতে একটি বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাকেই নির্দেশ করে।
মন্তব্য