খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জুন ২০২৬, ১১:২৯ পিএম

পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরে আইনসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট তীব্র অসন্তোষ ও টানা বিক্ষোভে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এই অঞ্চলে ঘনীভূত হওয়া সবচেয়ে বড় এই রাজনৈতিক সংকটে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং সাধারণ নাগরিকসহ অন্তত ২৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আঞ্চলিক প্রশাসন প্রধান সড়কগুলো অবরুদ্ধ করার পাশাপাশি মোবাইল ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে পুরো অঞ্চলজুড়ে এক নজিরবিহীন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, যা স্থানীয় জনজীবনকে মারাত্মক সংকটের মুখে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই স্পর্শকাতর ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সার্বিক চিত্রটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
Table of Contents
অঞ্চলটিতে চলমান এই তীব্র অস্থিরতা এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মূল কারণ হলো আসন্ন আঞ্চলিক আইনসভা নির্বাচন। আগামী ২৭ জুলাই পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরের ৪৫টি আসনে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে পাকিস্তান সরকারের একটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের দানা বাঁধে।
ভারতশাসিত কাশ্মীর থেকে বিভিন্ন সময়েবাস্তুচ্যুত হয়ে পাকিস্তানে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের জন্য আইনসভায় ১২টি আসন সংরক্ষিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন। কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর জোট ‘জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি’ (জেএএসি) এই আসন সংরক্ষণের তীব্র বিরোধিতা করে আন্দোলনে নামে। এই বিরোধিতার জেরে সংগঠনটি গত ৯ জুন সমগ্র অঞ্চলজুড়ে পূর্ণাঙ্গ ধর্মঘটের ডাক দেয়। এই ধর্মঘটের পর থেকেই আন্দোলনকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে ধাপে ধাপে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
আঞ্চলিক সরকারি কর্মকর্তা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, ৬ জুন থেকে ১৪ জুনের মধ্যবর্তী সময়ে বিক্ষোভকারীদের সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ ঘটে। এই সহিংসতায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২০ জন বেসামরিক সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন।
অঞ্চলের পুলিশপ্রধান লিয়াকত আলী মালিক গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিক্ষোভকারীদের হামলায় ৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন এবং আরও অন্তত ৯৭ জন পুলিশ কর্মী গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে পুলিশ এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অভিযান চালিয়ে এই আন্দোলন ও সহিংসতার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে এ পর্যন্ত ৫১৫ জনকে আটক করেছে।
বর্তমানে এই অঞ্চলের পরিস্থিতি অত্যন্ত থমথমে এবং সংঘাতপূর্ণ রয়েছে। আঞ্চলিক রাজধানী মুজাফফরাবাদ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে অবস্থিত রাওয়ালাকোটের সীমান্তবর্তী ও সংযোগ এলাকাগুলোতে এখনো হাজার হাজার জেএএসি সমর্থক ও কর্মী অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন। পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়া রোধ করতে এবং আন্দোলনকারীদের চলাচল সীমিত করতে স্থানীয় প্রশাসন সমস্ত প্রধান প্রধান সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে।
একই সাথে পুরো অঞ্চলে মোবাইল ইন্টারনেট ও ডেটা সেবা সম্পূর্ণ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। অনেক স্পর্শকাতর ও বাদানুবাদ প্রবণ এলাকায় গণমাধ্যম কর্মীদের প্রবেশাধিকারও সীমিত বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এর ফলে বাইরের পৃথিবীর সাথে এই অঞ্চলের সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
এই দীর্ঘস্থায়ী ও কঠোর অচলাবস্থার কারণে সবচেয়ে বেশি চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন ওই অঞ্চলের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ ও দিনমজুরেরা। রাজধানী মুজাফফরাবাদের ‘আপার আড্ডা’ নামক প্রধান বাণিজ্যিক এলাকায় প্রতিদিন শত শত দিনমজুর ও শ্রমিক কাজের আশায় এসে বসে থাকছেন, কিন্তু সব কিছু বন্ধ থাকায় কোনো কাজ বা উপার্জনের সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে পরিবার পরিজন নিয়ে তারা তীব্র খাদ্য সংকটে পড়েছেন।
সরকারি বিশেষ নির্দেশনার কারণে বেশিরভাগ বাজার ও দোকানপাট সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। জীবন রক্ষাকারী কিছু ওষুধের দোকান এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান অত্যন্ত সীমিত সময়ের জন্য খোলার অনুমতি দেওয়া হলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় সামগ্রিক ব্যাংকিং সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং এটিএম বুথগুলো পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। এছাড়া জ্বালানি সংকট তৈরি করতে এবং যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারি আদেশে সব পেট্রল পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে। স্থানীয় ট্যাক্সিচালক আসিফ নাজে জানিয়েছেন, যাদের ঘরে জমানো টাকা বা সঞ্চয় আছে, তারা কোনোভাবে দিন পার করতে পারলেও দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের ঘরে খাবার জুটছে না।
ঐতিহাসিকভাবে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভারতের তীব্র সমালোচনা করে আসছে এবং সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ধরেছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজেদের শাসনাধীন কাশ্মীরে এই ধরনের গণবিক্ষোভ, ব্যাপক প্রাণহানি, নির্বিচারে ধরপাকড় এবং সাধারণ মানুষের যোগাযোগ মাধ্যম সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার মতন ঘটনা ঘটায় আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র চাপের মুখে পড়েছে ইসলামাবাদের কেন্দ্রীয় সরকার। নিজস্ব ভূখণ্ডে তৈরি হওয়া এই মানবাধিকার ও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় এখন বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।
মন্তব্য