নিয়ন্ত্রণহীন অস্ত্র সরবরাহ, সমাজে বাড়ছে সহিংসতার ছায়া

সিলেট বিভাগে অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরকের চালান অব্যাহত থাকায় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে সহিংসতার আশঙ্কা। নির্বাচনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ স্পষ্ট। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং একের পর এক সমন্বয় বৈঠকের মাধ্যমে প্রস্তুতি জোরদার করা হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার সেনাপ্রধানের উপস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। একই দিনে বিজিবির সেক্টর কমান্ডার ও জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে পৃথক বৈঠকে নির্বাচনি সহিংসতা প্রতিরোধ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। এর আগে বুধবার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সিলেট সফর করে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে কঠোর নির্দেশনা দেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় সীমান্তে বিজিবির চৌকি বৃদ্ধি, তথ্যসংগ্রহকারী সোর্স সম্প্রসারণ এবং নগর ও গ্রামাঞ্চলে পুলিশ ও র‌্যাবের যৌথ অভিযান জোরদার করা হয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, গত এক বছরে সিলেট বিভাগে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার হয়েছে, যা নিরাপত্তা ঝুঁকির মাত্রা স্পষ্ট করে। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের ধরন ও পরিমাণ নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো—

উদ্ধারকৃত সামগ্রীপরিমাণ
দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র৩৮টি
এয়ারগান৭৫টি
লাইভ রাউন্ড গুলি১০৪ রাউন্ড
কার্তুজ ও প্যালেট২,১৫০টির বেশি
ম্যাগাজিন৫টি
উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক পাউডার ও জেলপ্রায় ৯.৬ কেজি
ডেটোনেটর (ইলেকট্রিক ও নন-ইলেকট্রিক)৫৪টি
সাউন্ড গ্রেনেড১টি
পেট্রোলবোমা৫টি

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, এসব অস্ত্র ও বিস্ফোরক কোথা থেকে আসছে, কারা জড়িত এবং কোথায় মজুত হচ্ছে—তা শনাক্তে গোয়েন্দা নজরদারি বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় বিশেষ চেকপোস্ট বসানো হয়েছে, নদীপথে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। আন্তঃজেলা সড়ক ও নগরীর প্রবেশপথে ব্যারিকেড বসিয়ে তল্লাশি চলছে। বৃহস্পতিবার বিজিবি ডগ স্কোয়াড ও সাঁজোয়া যান নিয়ে নগরীতে মহড়া দেয়, যা প্রস্তুতির দৃশ্যমান বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সিলেট বিভাগের মোট ২ হাজার ৬৪১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৩৬২টিকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও আনসারের সমন্বয়ে মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং ফোর্স ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ইউনিট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। রাতে বিশেষ অভিযান ও দিনে কড়া নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। ঝুঁকি মানচিত্র হালনাগাদ, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, রাজনৈতিক কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ এবং মিছিল-সমাবেশে শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বিএনপির সিলেট অঞ্চলের এক শীর্ষ নেতা মনে করেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার এই নির্বাচন কোনোভাবেই আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতায় প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে না। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতারা দৃশ্যমান অভিযান আরও জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনি মাঠ নিরাপদ রাখতে বডি ওর্ন ক্যামেরা, ড্রোন, ডগ স্কোয়াড ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।

র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবি একযোগে আশ্বস্ত করছে—নির্বাচনের আগে ও ভোটের দিন কঠোর নজরদারি থাকবে, যে কোনো নাশকতা কঠোর হাতে দমন করা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, নগর ও গ্রামাঞ্চল নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা থাকবে এবং ভোটাররা নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।