নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক শিশু রোগীর মাকে ধর্ষণের ন্যাক্কারজনক ঘটনায় তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। কমিটিকে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আজ বুধবার (১০ জুন) দুপুরে নাটোরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ মশিউর রহমান তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে কমিটির সদস্যদের নাম প্রকাশ করতে তিনি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। সিভিল সার্জন জানান, কমিটিতে হাসপাতালের একজন কর্মকর্তার পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিভাগের বাইরে থেকে আরও দুইজন কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ ও সিসিটিভি ফুটেজ
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত রবিবার রাত ১০টার দিকে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি দুই বছর বয়সি এক কন্যাশিশুর মাকে ওষুধ দেওয়ার কথা বলে হাসপাতালের লিফটে করে ছয়তলার সিঁড়িঘরে নিয়ে যায় অমিত (২৩) নামের এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী। সেখানে ওই ভুক্তভোগী নারীকে ধর্ষণ করা হয়। এই অপরাধের সময় অনিল ও প্রাঙ্গণ নামের আরও দুই পরিচ্ছন্নতাকর্মী মোবাইল ফোনে ঘটনাটির ভিডিও ধারণ করে। পরবর্তীতে ভুক্তভোগীকে সেখানে আটকে রেখে এবং সেই ভিডিও দেখিয়ে আবারও ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়।
দীর্ঘ সময় মায়ের অনুপস্থিতিতে শিশুটির কান্না শুনে রাত আনুমানিক ২টার দিকে হাসপাতালের আনসার সদস্যরা সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করেন। ফুটেজের সূত্র ধরে তারা ছয়তলার সিঁড়িঘরে গিয়ে অভিযুক্তদের হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম হন। তবে পরবর্তীতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আটককৃত অভিযুক্তদের পুলিশে না দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার একটি গুরুতর অভিযোগ ওঠে।
মামলার বিবরণ ও আসামিদের তথ্য
এই ঘটনার পর ভুক্তভোগী নারীর বাবা বাদী হয়ে নাটোর সদর থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ শহরের আলাইপুর এলাকার সুইপার কলোনিতে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত তিন পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে গ্রেফতার করে।
অভিযুক্তদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও অপরাধের বিবরণ:
| আসামির নাম ও বয়স | পেশাগত পরিচয় | অপরাধে সম্পৃক্ততা ও ভূমিকা | বর্তমান আইনি অবস্থা |
| অমিত (২৩) | পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নাটোর সদর হাসপাতাল | ওষুধ দেওয়ার কথা বলে ভুক্তভোগীকে সিঁড়িঘরে নিয়ে ধর্ষণ এবং পরবর্তীতে পুনরায় ধর্ষণচেষ্টা। | গ্রেফতার ও পুলিশি হেফাজতে। |
| অনিল (২৪) | পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নাটোর সদর হাসপাতাল | ধর্ষণের ঘটনাটির ভিডিও ধারণ করা এবং ভুক্তভোগীকে আটকে রেখে পুনরায় নির্যাতনে সহায়তা। | গ্রেফতার ও পুলিশি হেফাজতে। |
| প্রাঙ্গণ (২৩) | পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নাটোর সদর হাসপাতাল | অনিলের সাথে যৌথভাবে ভিডিও ধারণ ও ভুক্তভোগীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে আটকে রাখায় সহযোগিতা। | গ্রেফতার ও পুলিশি হেফাজতে। |
পুলিশি তদন্ত ও স্থানীয়দের ক্ষোভ
নাটোর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনসুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, ইতিপূ্র্বেই ভুক্তভোগী নারীর আইনি জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে তার প্রয়োজনীয় মেডিকেল পরীক্ষাও সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া অপরাধের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে হাসপাতালের ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ জব্দ করেছে পুলিশ। ওসি আরও আশ্বাস দেন যে, মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং অপরাধী যেই হোক না কেন, আইন অনুযায়ী কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
এদিকে ঘটনার পরপরই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো কঠোর আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়া এবং আসামিদের ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠায় স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগীর পরিবারের দাবি, ঘটনার শুরুতে হাসপাতাল প্রশাসন বিষয়টিকে উপযুক্ত গুরুত্ব দেয়নি। বর্তমানে ভুক্তভোগী নারী এবং তার পুরো পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
