বিশেষ প্রতিবেদন, নাটোর: নাটোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক অবুজ শিশুকন্যার পাশে থাকা অসহায় মাকে ধর্ষণের এক পৈশাচিক ও ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। সরকারি হাসপাতালের মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নিরাপদ আশ্রয়ে এমন বর্বরোচিত অপরাধ সংঘটিত হওয়ায় স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনাটি দেশের সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক বড় ধরণের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। এই জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে হাসপাতালের তিন আউটসোর্সিং কর্মীকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) ভুক্তভোগী নারীর বাবার লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে আসামিদের আইনের আওতায় আনে।
মামলার এজাহার, পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, নাটোর সদর উপজেলার বাসিন্দা ওই নারী তার দুই বছর বয়সী অসুস্থ কন্যাসন্তানের চিকিৎসার জন্য গত ৫ জুন নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হন। ভুক্তভোগী নারীর স্বামী জীবিকার তাগিদে জেলার বাইরে অবস্থান করায় হাসপাতালে দিন-রাত এক করে একাই ওই অসুস্থ শিশুর দেখভাল করছিলেন তিনি। গত ৭ জুন (রবিবার) গভীর রাতে শিশু ওয়ার্ডে কর্তব্যরত এক আউটসোর্সিং কর্মী ওষুধ দেওয়ার প্রলোভন ও মিথ্যা অজুহাতে ওই মাকে কৌশলে ওয়ার্ডের বাইরে ডেকে নিয়ে যায়।
এরপর হাসপাতালের ষষ্ঠ তলার একটি নির্জন, পরিত্যক্ত ও অন্ধকার সিঁড়িঘরে নিয়ে অমিত (২৩) নামের ওই কর্মী তাকে জোরপূর্বক ও পাশবিকভাবে ধর্ষণ করে। এ সময় এই পৈশাচিক অপরাধে সরাসরি সহযোগিতা করতে করতে অপর দুই কর্মী অনিল (২৪) ও প্রাঙ্গণ (২৩) পুরো ঘটনার ভিডিও চিত্র নিজেদের মোবাইল ফোনে ধারণ করে। পরবর্তীতে এই আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে তারা ভুক্তভোগীকে চুপ থাকতে এবং বিষয়টি গোপন রাখতে বাধ্য করার চেষ্টা করে।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও অভিযুক্তদের তথ্যবিবরণ
| বিষয়/তথ্য | বিস্তারিত বিবরণ |
| প্রতিষ্ঠানের নাম ও স্থান | নাটোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, নাটোর সদর। |
| ভুক্তভোগীর পরিচয় | হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন দুই বছর বয়সী শিশুর মা। |
| প্রধান অভিযুক্ত | অমিত (২৩), হাসপাতালের আউটসোর্সিং কর্মী। |
| সহযোগী অভিযুক্তবৃন্দ | অনিল (২৪) ও প্রাঙ্গণ (২৩), হাসপাতালের আউটসোর্সিং কর্মী (ভিডিও ধারণকারী)। |
| অপরাধের স্থান | হাসপাতাল ভবনের ষষ্ঠ তলার নির্জন ও অন্ধকার সিঁড়িঘর। |
| घटनाর তারিখ ও সময় | ৭ জুন, রবিবার (গভীর রাত)। |
| মামলা ও গ্রেপ্তারের তারিখ | ৯ জুন, মঙ্গলবার। |
| আইনি ধারা | নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনসহ)। |
এদিকে গভীর রাতে দীর্ঘক্ষণ মায়ের অনুপস্থিতি টের পেয়ে শিশুটি হাসপাতালের শয্যায় অনবরত কান্নাকাটি করতে থাকে। গভীর রাতে হাসপাতালের নিস্তব্ধতার মধ্যে শিশুর অবিরাম ও করুণ কান্না শুনে ওয়ার্ডে দায়িত্বরত নার্স এবং অন্যান্য রোগীর স্বজনদের মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়। তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যদের জানানো হলে তারা দ্রুত তৎপর হয়ে ওঠেন। আনসার সদস্যরা হাসপাতালের সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে ভবনের একটি নির্দিষ্ট অংশে সন্দেহভাজন নড়াচড়া দেখতে পান। এরপর তারা দ্রুত ষষ্ঠ তলার সিঁড়িঘরে গিয়ে অবরুদ্ধ ও বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে ওই নারীকে উদ্ধার করেন এবং অভিযুক্তদের আটকে রাখেন। পরদিন সকালে ভুক্তভোগীর স্বামী হাসপাতালে পৌঁছালে ওই নারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাঁর ওপর হওয়া অমানুষিক নির্যাতনের পুরো ঘটনাটি প্রকাশ করেন।
এই বর্বরোচিত ঘটনার পর মঙ্গলবার সকালে ভুক্তভোগী নারীর বাবা বাদী হয়ে নাটোর সদর থানায় একটি লিখিত এজাহার দায়ের করেন। ঘটনার গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে নাটোর সদর থানা পুলিশ তাৎক্ষণিক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে অভিযুক্ত তিন কর্মীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
নাটোর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনসুর রহমান গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করে বলেন, “ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত মামলা দায়েরের পরপরই আমরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পদক্ষেপ নিয়েছি এবং ঘটনার সাথে জড়িত মূল অভিযুক্তসহ তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছি। তাদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এই ধরণের জঘন্য ও পৈশাচিক অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধী যে-ই হোক না কেন, কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মামলার তদন্ত করছি।”
এই ঘটনার পর হাসপাতালের মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল, মানবিক ও নিরাপদ স্থানে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ ও আইনগত প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সচেতন নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণীর জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড, অতীত রেকর্ড বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যথাযথভাবে পুলিশ ভেরিফিকেশন বা যাচাই-বাছাই না করার ফলেই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা এই বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করবে এবং হাসপাতালের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো রোগী বা তাদের স্বজনদের এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়।
