খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই জুলাই ২০২৬, ১০:৪২ পিএম

নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জামফারা অঙ্গরাজ্যে এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। টানা দুই দিনব্যাপী চালানো এক সাঁড়াশি অভিযানে ৩০০ জনেরও বেশি সশস্ত্র ডাকাত ও অপহরণকারী নিহত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির সরকার। শনিবার জামফারা অঙ্গরাজ্যের তথ্য কমিশনার মাহমুদ মুহাম্মদ দান্তাওয়াসা এক বিবৃতিতে এই সফল অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, গুম্মি জেলায় ডাকাতদের একটি বিশাল ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে নিরাপত্তা বাহিনী এই সফল অভিযান পরিচালনা করে, যেখানে বিপুল সংখ্যক সন্ত্রাসী প্রাণ হারায়।
দেশটির উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষ ডাকাত ও বিভিন্ন অপরাধী চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে আছে। গবাদিপশু চুরি, নির্বিচারে অপহরণ এবং জঙ্গি হামলায় ওই অঞ্চলের মানুষের জীবন এখন চরম বিপর্যস্ত। এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো শুধু যে লুটপাট চালায় তা-ই নয়, তারা স্থানীয় কৃষকদের জমিতে চাষাবাদ করার জন্য মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অনেক সময় জমিতে হামলা চালিয়ে ফসলও নষ্ট করে দেওয়া হয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিকে খুবই উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন। তাদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব সাধারণ অপরাধী চক্র বা ডাকাতদের সাথে কট্টরপন্থী জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর গোপন যোগাযোগ ও কৌশলগত সহযোগিতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের দুর্বল কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে তারা প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে নিজেদের আধিপত্য আরও বিস্তার করছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা এএফপি স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, গত বুধবার রাতে প্রায় এক হাজার সশস্ত্র ডাকাত ওই এলাকায় চড়াও হয়ে বিপুল পরিমাণ গবাদিপশু লুট করে নিয়ে যাচ্ছিল। এই ঘটনার পরপরই দেশটির সেনাবাহিনী ও স্থানীয় সশস্ত্র স্বেচ্ছাসেবকরা একজোট হয়ে ডাকাতদের পিছু নেয় এবং যৌথ অভিযান শুরু করে। রাতভর এবং পরদিন সকাল পর্যন্ত দুপক্ষের মধ্যে তীব্র ও সম্মুখ যুদ্ধ চলে। স্থানীয় বাসিন্দা আবুবকর মুহাম্মদ জানান, সেই রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে ৩০০ জনের বেশি ডাকাত ঘটনাস্থলেই নিহত হয়।
স্থানীয়দের কাছ থেকে আরও জানা যায় যে, এর আগে প্রায় দুই সপ্তাহ আগেও নাইজেরিয়ার সেনাবাহিনী এই একই ঘাঁটিতে অভিযান চালানোর একটি চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সে সময় ডাকাতদের সংখ্যা অনেক বেশি থাকায় এবং তাদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে সেনা সদস্যরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। জামফারা অঙ্গরাজ্যের সরকার মনে করছে, দেশের ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার লড়াইয়ে এই সফল অভিযানটি একটি বড় মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
নাইজেরিয়া বর্তমানে একসঙ্গে একাধিক বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকটে জর্জরিত। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বোকো হারাম ও আইএসডব্লিউএপির (ISWAP) মতো কুখ্যাত জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থেকে রক্তপাত ঘটিয়ে চলেছে। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সহায়তায় জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নাইজেরিয়ার সরকার কিছু দৃশ্যমান সাফল্য পেয়েছে। এর আগে গত মে মাসে এক যৌথ অভিযানে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) এক শীর্ষ নেতাসহ প্রায় ২০০ জঙ্গি নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছিল দেশটির প্রশাসন।
এত কিছুর পরও চরম দারিদ্র্য ও আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার কারণে দেশটিতে সশস্ত্র ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনা জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে হানা দিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের গণ-অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করা এখন দেশটিতে একটি লাভজনক অপরাধে পরিণত হয়েছে। এই সংঘাতের মধ্যেই সেনাবাহিনী শনিবার জানিয়েছে, জিহাদিদের হাত থেকে ৪০ জনের বেশি শিশুকে উদ্ধার করতে গিয়ে সেনাবাহিনীর ভেতরেও কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ঘটনাটি ঘটেছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। এতদিন এই অঞ্চলটিকে নাইজেরিয়ার অন্যান্য অংশের তুলনায় বেশ নিরাপদ ও শান্ত বলে মনে করা হতো। জামফারার এই বড় জয় চলমান নিরাপত্তা সংকটের মধ্যে সরকারের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর হলেও, দেশটিতে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এখনো এক দূরহ বিষয় বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বিশ্লেষকরা।
মন্তব্য