জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

ইরানি হামলার মুখে উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটি ইসরায়েলে সরানোর পরিকল্পনা

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নজিরবিহীন টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ইরান যে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, তাতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের সামরিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড়সড় কৌশলগত পরিবর্তনের কথা ভাবছে মার্কিন প্রশাসন। নিরাপত্তার স্বার্থে এই অঞ্চলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি সরাসরি ইসরায়েলে সরিয়ে নেওয়ার একটি পরিকল্পনা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাহরাইনে অবস্থিত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন নৌঘাঁটি সংস্কারের ব্যাপারে ওয়াশিংটন এখন নতুন করে ছক কষছে। একই সাথে কুয়েত ও সৌদি আরবে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আগের চেয়ে অনেকটাই কমিয়ে আনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। মার্কিন প্রশাসনের দুই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিশ্চিত করেছেন যে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটায় ওয়াশিংটন চাইলে মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামোগুলো ইসরায়েলে স্থানান্তর করতে পারে, যা এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক কৌশলে একটি বড় ধরনের রদবদল।

ইরানি হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রতিক্রিয়ায় ওই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে নজিরবিহীন পাল্টা হামলা চালায় তেহরান। বিশেষ করে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরটি বারবার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ইরানি বাহিনীর এই পিন-পয়েন্ট হামলায় মার্কিন কমান্ড সদর দপ্তরসহ প্রায় এক ডজন সামরিক স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এই হামলার পর বেশ কিছু দিন অতিবাহিত হলেও মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর (পেন্টাগন) এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ বা কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশ করেনি। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন ঘাঁটির এই অরক্ষিত অবস্থা ওয়াশিংটনকে তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করছে।

চুক্তি ও মার্কিন জনমনে সংশয়

এদিকে মাঠপর্যায়ের এই যুদ্ধাবস্থার মাঝেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘ইরানি হুমকি দূর করার’ যে লক্ষ্য নিয়ে এই অভিযান শুরু করেছিলেন, তা নিয়ে খোদ মার্কিন নাগরিকদের মনে তীব্র অসন্তোষ ও সংশয় দেখা দিয়েছে। অভিযান শুরুর মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও সামরিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন রূপ নেওয়ায় মার্কিন সাধারণ জনগণের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

সম্প্রতি এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সাময়িক অবসানের লক্ষ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ (এমওইউ) নামে পরিচিতি পেয়েছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, সংকটের একটি স্থায়ী সমাধানের খোঁজে বর্তমানে ৬০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে।

তবে এই সমঝোতা মার্কিন নাগরিকদের ক্ষোভ ও সংশয় কমাতে পারেনি। কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের দেশব্যাপী পরিচালিত এক সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ মার্কিন ভোটারই স্পষ্ট মনে করেন যে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের এই সামরিক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মোটেও লাভজনক হয়নি।

কুইনিপিয়াকের এই জরিপটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে। চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির কারণে অভিযানের মূল লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৬১ শতাংশ নাগরিক বিশ্বাস করেন, এই দীর্ঘ আলোচনার পরও ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার সম্ভাবনা পুরোপুরি রয়ে গেছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ইস্যুতে মার্কিন ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় শিবিরের সমর্থকদের মধ্যেই কোনো মতভেদ নেই। দুই দলের সমর্থকরাই একমত যে, এই অভিযানের পরও ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ থেকে বিচ্যুত করা সম্ভব হয়নি। এই জনমত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

Tags :

Ratul

Recent News