খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই জুলাই ২০২৬, ১০:৫৯ পিএম

কানসাসের তপ্ত রোদ মাথায় নিয়ে সুইজারল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দলের অনুশীলনে এক অদ্ভুত ও চমকপ্রদ কৌশল দেখা গেল। মাঠের এক কোণে মূল ফুটবল ফেলে দিয়ে হাতে ছোট ছোট টেনিস বল তুলে নিয়েছেন তিন দীর্ঘদেহী ফুটবলার—গ্রেগর কোবেল, ইভন এমভোগো ও মারভিন কেলার। এই তিনজনই চলমান বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের রক্ষণভাগের শেষ ভরসা, তথা দলের নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক। ফুটবল বিশ্বকাপের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের ঠিক আগে মূল ফুটবল ছেড়ে তাঁদের এমন টেনিস বল নিয়ে মেতে ওঠার দৃশ্য দেখে যে কেউ কিছুটা চমকে যেতে পারেন। তবে সামনে যখন প্রতিপক্ষ হিসেবে আছেন ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি আর বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, তখন রণকৌশল ও প্রস্তুতিতে এমন অভিনবত্ব আসতেই পারে।
আগামী রোববার (১২ জুলাই) বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় কানসাস সিটিতে সেমিফাইনালে ওঠার মহালড়াইয়ে শক্তিশালী আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হচ্ছে সুইজারল্যান্ড। ১৯৫৪ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পা রেখেছে সুইসরা। দীর্ঘ ৭২ বছর পর পাওয়া এই ঐতিহাসিক ও সোনালী সুযোগটি কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে রাজি নন তাঁরা। আর তাই মেসি-ব্রিগেডের বুলেট গতির আচমকা শট ও ফ্রি-কিকগুলো রুখে দিতে টেনিস বলের এই বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক কৌশল বেছে নিয়েছেন সুইস গোলরক্ষক কোচ।
শুক্রবার কানসাসে সুইজারল্যান্ডের মূল দলের বাকি ফুটবলাররা যখন হালকা মেজাজে গা গরম করছিলেন, তখন তিন গোলরক্ষককে নিয়ে কড়া ঘাম ঝরাচ্ছিলেন তাঁদের কোচ। লক্ষ্য একটাই—যেকোনো মূল্যে আর্জেন্টিনার বিধ্বংসী আক্রমণভাগকে আটকে দেওয়া। অনুশীলনে তাঁদের মূল কাজ ছিল ছোট ছোট হলুদ টেনিস বল নিয়ে হাঁটা আর বাতাসে সেই বল অনবরত জাগলিং করা। ফুটবল মাঠে গোলরক্ষকদের রিফ্লেক্স ও চোখের পলকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য টেনিস বলে অনুশীলন করার এই কৌশল অবশ্য ফুটবলে নতুন কিছু নয়। বিশ্বমঞ্চে এই কৌশলের কার্যকারিতা আগেও দারুণভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
২০১৪ সালের বিশ্বকাপে কোস্টারিকার গোলরক্ষক কেইলর নাভাস এই টেনিস বলের কৌশলটা বিশ্বমঞ্চে তুমুল জনপ্রিয় করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই টেনিস বলে অনুশীলন করা নাভাস সেবার কোস্টারিকাকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছিলেন গোলপোস্টের নিচে এক অবিশ্বাস্য ও দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে। ফুটবলারদের মতে, টেনিস বলের আকার ফুটবলের চেয়ে অনেক ছোট হওয়ায় এবং বাতাসে এর গতিপথ হুট করে বদলে যাওয়ার প্রবণতা থাকার কারণে এটি গোলরক্ষকদের দৃষ্টিশক্তি ও রিফ্লেক্সকে অনেক বেশি তীক্ষ্ণ ও কার্যক্ষম করে তোলে।
সুইজারল্যান্ডের সাবেক কিংবদন্তি ও দীর্ঘদিনের অতন্দ্র প্রহরী গোলরক্ষক ইয়ান সোমারও নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এই কৌশলের ওপর অন্ধ ভরসা রাখতেন। অনুশীলনে পেনাল্টি স্পট থেকে কোচ যখন টেনিস র্যাকেট দিয়ে ছোট বলে তীব্র গতিতে শট নিতেন, সোমার তখন চোখের পলকে নিজের শরীর শূন্যে ছুড়ে দিয়ে তা রুখে দিতেন। বর্তমান সুইস কোচও তাঁর বর্তমান শিষ্যদের জন্য সেই একই পুরোনো ও ভীষণ কার্যকর টোটকা ব্যবহার করছেন। ছোট আকারের এই হলুদ বল বাতাসে ভাসার পর চোখে ধরা দেয় একটু দেরিতে। তাই এটি তালুবন্দী করতে ফুটবলারদের হাতের মুভমেন্ট ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়—দুটিই থাকে খুব কম। নিখুঁত গ্রিপ আর দারুণ শারীরিক ক্ষিপ্রতা ছাড়া টেনিস বল আটকানো প্রায় অসম্ভব।
আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের ফুটবলারদের গোলমুখে নেওয়া আচমকা, বাঁকানো এবং তীব্র গতির শটগুলো সামলাতেই মূলত সুইসদের এই বিশেষ ফন্দি। আলবিসেলেস্তেদের রুখে দেওয়ার এই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ফর্মুলা কতটা কাজ করে, তা নিয়ে ভক্তদের কৌতূহল এখন তুঙ্গে। দীর্ঘ ৭২ বছর পর বিশ্বকাপের শেষ আটের মঞ্চে নামার আগে সুইস গোলরক্ষকদের এই বিশেষ প্রযুক্তি ও কঠিন প্রস্তুতি মাঠের আসল লড়াইয়ে লিওনেল মেসিদের সামনে কতটা প্রতিরোধ গড়তে পারে, তা দেখার জন্য ফুটবল বিশ্বকে রোববার সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হচ্ছে।
মন্তব্য