আইভিএফ বীমায় বিশ্ব এগোচ্ছে, বাংলাদেশে অগ্রগতি ধীর

বিশ্বজুড়ে বন্ধ্যাত্বজনিত সমস্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শরীরের বাইরে ডিম্বাণু নিষেকভিত্তিক চিকিৎসার চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। তবে উচ্চ ব্যয়ের কারণে এই চিকিৎসা পদ্ধতি এখনও বহু দম্পতির জন্য সহজলভ্য হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের চিকিৎসাকে স্বাস্থ্যবীমার আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা গেলে চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ যেমন বাড়বে, তেমনি চিকিৎসা সম্পন্ন করার হারও উন্নত হবে।

শরীরের বাইরে ডিম্বাণু নিষেকভিত্তিক চিকিৎসা একটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন হওয়া জটিল প্রক্রিয়া। প্রথমে ডিম্বাশয়কে উদ্দীপিত করা হয়, এরপর ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তী ধাপে পরীক্ষাগারে ডিম্বাণুর সঙ্গে শুক্রাণুর মিলন ঘটিয়ে ভ্রূণ তৈরি করা হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ে তা জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়। একটি পূর্ণ চিকিৎসা চক্র সাধারণত দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় নেয়। তবে সফলতার সম্ভাবনা বাড়াতে অনেক ক্ষেত্রে একাধিক চক্র সম্পন্ন করতে হয়।

চিকিৎসা সফলতার হার বয়সভেদে পরিবর্তিত হয়। পঁয়ত্রিশ বছরের নিচে নারীদের ক্ষেত্রে প্রতি চক্রে সফলতার হার প্রায় পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্ন শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। আটত্রিশ থেকে চল্লিশ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে এই হার কমে প্রায় বিশ থেকে ত্রিশ শতাংশে নেমে আসে। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সফলতার হার আরও হ্রাস পায়।

তবে এই চিকিৎসার সবচেয়ে বড় বাধা হলো ব্যয়। যুক্তরাষ্ট্রে একটি চিকিৎসা চক্রের ব্যয় সাধারণত বারো হাজার থেকে ত্রিশ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর সঙ্গে ওষুধ ও অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয় যোগ হলে মোট খরচ আরও বৃদ্ধি পায়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ব্যয় তুলনামূলক কম হলেও তা কয়েক হাজার ইউরোর নিচে সাধারণত থাকে না। ফলে অনেক দম্পতি আর্থিক কারণে চিকিৎসা শুরু করলেও সম্পূর্ণ করতে পারেন না।

নিম্নের সারণিতে বিভিন্ন অঞ্চলে এই চিকিৎসার বীমা কাভারেজ পরিস্থিতি উপস্থাপন করা হলো—

অঞ্চলবীমা কাভারেজের অবস্থাবৈশিষ্ট্য
যুক্তরাষ্ট্রকিছু অঙ্গরাজ্যে আংশিক বাধ্যতামূলকনির্দিষ্ট চক্র ও ব্যয়ের সীমা প্রযোজ্য
ইউরোপের বিভিন্ন দেশআংশিক বা পূর্ণ সরকারি সুবিধাশর্তসাপেক্ষে একাধিক চক্র কাভার
নেদারল্যান্ডসনির্দিষ্ট শর্তে তিনটি পর্যন্ত চক্রসরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত
বাংলাদেশসম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যয়ে পরিচালিতবীমা কাভারেজ নেই

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা ব্যয় এখনো এই ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। অনেক দম্পতি চিকিৎসা শুরু করলেও আর্থিক চাপের কারণে মাঝপথে থেমে যেতে বাধ্য হন। যেসব দেশে বীমা কাভারেজ রয়েছে, সেখানে রোগীরা তুলনামূলকভাবে বেশি চিকিৎসা সম্পন্ন করেন এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

বাংলাদেশে এই চিকিৎসা মূলত বেসরকারি পর্যায়ে সীমিত রয়েছে এবং এর পুরো ব্যয় রোগীকেই বহন করতে হয়। এখন পর্যন্ত কোনো স্বাস্থ্যবীমা পরিকল্পনায় এই চিকিৎসাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বীমা খাতে পণ্য সম্প্রসারণের সীমাবদ্ধতা এবং স্বাস্থ্যবীমার সীমিত পরিসর এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

বিশ্লেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যবীমা খাতে এই চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত করা গেলে তা রোগীদের জন্য যেমন সুবিধাজনক হবে, তেমনি বীমা খাতের পরিসরও বৃদ্ধি পাবে। সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে করপোরেট পর্যায়ে কর্মীদের জন্য এ ধরনের চিকিৎসা সুবিধা যুক্ত করার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

ফলে শরীরের বাইরে ডিম্বাণু নিষেকভিত্তিক চিকিৎসার বীমা কাভারেজ সম্প্রসারণ শুধু চিকিৎসা সহজলভ্য করার বিষয় নয়, বরং বহু দম্পতির পরিবার গঠনের দীর্ঘ অপেক্ষাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।