দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য নতুন এইচ-১বি (H-1B) ভিসার ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত এক লাখ ডলারের বর্ধিত ফি সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত। গত সোমবার বোস্টনের মার্কিন জেলা আদালতের বিচারক লিও সোরোকিন এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। আদালতের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন সংক্রান্ত একটি বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ বড় ধরনের আইনি ধাক্কা খেল। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মার্কিন বিচার ব্যবস্থার এই সিদ্ধান্ত মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির ওপর সরাসরি একটি বড় আইনি প্রতিরোধ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
Table of Contents
আদালতের রায় ও আইনি ব্যাখ্যা
আদালতের রায়ে বিচারক লিও সোরোকিন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক আরোপিত এই বিশাল অঙ্কের ফি মূলত একটি সম্পূর্ণ অবৈধ কর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো ধরনের নতুন কর বা আর্থিক বাধ্যবাধকতা আরোপের চূড়ান্ত ক্ষমতা কেবল মার্কিন আইনসভা তথা কংগ্রেসের হাতে ন্যস্ত থাকে। এই বর্ধিত ফি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি এবং মার্কিন কংগ্রেস কখনও এই ধরনের অতিরিক্ত ফি আদায়ের অনুমোদন দেয়নি।
ট্রাম্প প্রশাসনের গত সেপ্টেম্বর মাসের একটি বিতর্কিত ঘোষণার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ২০ জন ডেমোক্র্যাট অ্যাটর্নি জেনারেল যৌথভাবে একটি মামলা দায়ের করেছিলেন। ওই প্রশাসনিক ঘোষণায় এইচ-১বি ভিসা পাওয়ার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে দক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছিল। সেই মামলার দীর্ঘ শুনানি ও গভীর আইনি পর্যালোচনা শেষে আদালত এই চূড়ান্ত রায় প্রদান করলেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি ও আদালতের পাল্টা যুক্তি
মামলা পরিচালনাকালে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনি যুক্তি ও জোরালো দাবি করা হয়েছিল যে, এই এক লাখ ডলারের ফি কোনো সাধারণ কর বা বেআইনি বিষয় নয়, বরং এটি একটি বৈধ আর্থিক জরিমানা। ফেডারেল অভিবাসন আইনের আওতায় প্রেসিডেন্ট এই ধরনের আর্থিক জরিমানা বা প্রশাসনিক বিধি-নিষেধ আরোপ করার একক আইনি ক্ষমতা রাখেন। ওই বিশেষ আইন অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সার্বিক জাতীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর বা হুমকিস্বরূপ মনে হলে নির্দিষ্ট কোনো বিদেশি নাগরিক বা বিশেষ কোনো শ্রেণির প্রবেশ সীমিত করার ক্ষমতা দেশের প্রেসিডেন্টের রয়েছে।
তবে বিচারক সোরোকিন প্রশাসনের এই দাবি ও ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন, এক লাখ ডলারের এই বিশাল পরিমাণ অর্থ কোনোভাবেই প্রশাসনিক জরিমানা বা সাধারণ ফির আওতায় পড়ে না, বরং এটি একটি প্রত্যক্ষ করের সমতুল্য। আর মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী এই ধরনের কর আরোপের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে আইনসভা বা কংগ্রেসের কোনো বৈধ অনুমোদন ছিল না। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর (Department of State) এবং ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (USCIS) এই নিয়মটি দেশজুড়ে বাস্তবায়ন বা কার্যকর করতে পারে না।
সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী রায়ের সূত্র ও আইনি নজির
বিচারক লিও সোরোকিন তাঁর এই সিদ্ধান্তটি গ্রহণের ক্ষেত্রে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ের নজির ও আইনি সূত্র উল্লেখ করেন। ওই সময়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিতর্কিত শুল্কনীতি বাতিল করে একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করেছিলেন। বিচারক সোরোকিনের মতে, সুপ্রিম কোর্টের সেই রায়ের আইনি যুক্তি ও সাংবিধানিক নীতি পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, অভিবাসন আইনের দোহাই দিয়ে বা এর বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে কোনো ধরনের নতুন কর আরোপ করার আইনগত ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ছিল না। ফলে নিম্ন আদালত সুপ্রিম কোর্টের সেই আইনি নজির কঠোরভাবে অনুসরণ করেই এই ফি বাতিলের আদেশ দেন।
হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ আইনি পদক্ষেপ
আদালতের এই রায়ের পর হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেইলর রজার্স এক বিবৃতিতে বলেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী। তারা জোরালোভাবে আশা করছেন, উচ্চতর আদালতে আপিলের মাধ্যমে বিচারক সোরোকিনের এই আদেশটি সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যাবে এবং প্রেসিডেন্টের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত পুনর্বহাল হবে।
মুখপাত্র আরও দাবি করেন, আমেরিকার সর্বোত্তম জাতীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থি বলে মনে করা যে কোনো শ্রেণির বিদেশি নাগরিকের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণভাবে সীমিত বা নিয়ন্ত্রণ করার সুস্পষ্ট আইনি ক্ষমতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের রয়েছে। আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেশের সার্বিক স্বার্থ সুরক্ষার্থেই এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, যা সম্পূর্ণ আইনসম্মত ছিল।
এইচ-১বি ভিসা প্রোগ্রাম ও এর বর্তমান প্রেক্ষাপট
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এইচ-১বি (H-1B) প্রোগ্রামের আওতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, গণিত ও প্রকৌশলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি কর্মীদের কাজের সুযোগ দিয়ে থাকে। এই কর্মসূচির অধীনে প্রতিবছর সাধারণ কোটায় ৬৫ হাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি বা মাস্টার্স সম্পন্নকারীদের জন্য বিশেষ কোটায় আরও ২০ হাজারসহ সর্বমোট ৮৫ হাজার ভিসা ইস্যু করা হয়। এই বিশেষ কর্মসংস্থান ভিসার মেয়াদ সাধারণত প্রাথমিক ও বর্ধিত সময় মিলিয়ে তিন থেকে সর্বোচ্চ ছয় বছর পর্যন্ত অনুমোদিত হয়ে থাকে।
উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই বিতর্কিত নতুন ফি সংক্রান্ত ঘোষণার আগে, মার্কিন নিয়োগকর্তারা সাধারণত বিভিন্ন আইনি ও প্রশাসনিক কারণের ভিত্তিতে কর্মীপ্রতি দুই হাজার থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ডলার পর্যন্ত সরকারি ফি প্রদান করতেন। আকস্মিকভাবে এই ফি বাড়িয়ে এক লাখ ডলার করায় মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও দক্ষ বিদেশি কর্মীদের মাঝে ব্যাপক উদ্বেগ ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছিল, যা আদালতের এই রায়ের মাধ্যমে সাময়িকভাবে স্থগিত হলো। এই রায়ের ফলে বিশ্বজুড়ে দক্ষ পেশাজীবীদের মার্কিন কর্মসংস্থানে যুক্ত হওয়ার পথটি পুনরায় উন্মুক্ত হলো।
