জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই আগস্ট ২০২৬, ১০:৪ পিএম

দেশের অন্যতম সুন্দর প্রাকৃতিক জলাভূমি ও রামসার সাইট সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের অনন্য পরিবেশ, দুর্লভ জীববৈচিত্র্য এবং স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষা করতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন। হাওরের ঘোষিত ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ বা ইসিএ (ECA)-র ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে পরবর্তী নির্দেশ জারি না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের হাউসবোট ও পর্যটক বহনকারী নৌযানের যাতায়াত সম্পূর্ণরূপে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
একই সাথে, হাওরে চলাচলকারী সকল প্রকার হাউসবোট ও নৌযানের মালিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে আগামী ১০ আগস্টের ভেতরে তাদের নৌযানের যথাযথ নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ব্যবসা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ শাখা থেকে গত শনিবার (১ আগস্ট) জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান স্বাক্ষরিত এক বিশেষ গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নতুন বিধিনিষেধগুলো সর্বসাধারণের উদ্দেশ্যে প্রচার করা হয়।
গণবিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, ‘টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা আদেশ, ২০২৫’-এর আলোকে এই মহতী প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করা এবং স্থানীয় পর্যটন খাতে সুশাসন ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য। ঘোষিত নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনের উল্লেখযোগ্য শর্ত ও নির্দেশনাসমূহ:
প্রবেশ ও চলাচলে সাময়িক বাধা: পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হাওরের সংকটাপন্ন সীমানায় কোনো ধরনের পর্যটকবাহী নৌকা বা বিলাসবহুল হাউসবোট ঢুকতে পারবে না।
নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা: আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে নির্দিষ্ট ফরমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিবন্ধনের আবেদন পৌঁছাতে হবে। জেলা প্রশাসনের পূর্বানুমোদন বা নিবন্ধন ছাড়া কোনো নৌযান চালানো যাবে না।
শব্দ ও প্লাস্টিক দূষণ রোধ: নৌযানে মাইক, লাউডস্পিকার, উচ্চশব্দে গান-বাজনা কিংবা পার্টির আয়োজন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক (Single-use plastic) হাওর এলাকায় বহন করা যাবে না।
বর্জ্য নিষ্কাশন ও কাঠামোগত নিয়ম: হাওরের জলে কোনো ধরনের ময়লা ফেলা যাবে না। প্রতিটি নৌযানে বাধ্যতামূলকভাবে আধুনিক সেপটিক ট্যাংক এবং অন্তত দুটি ডাস্টবিন থাকতে হবে। এছাড়া কোনো হাউসবোটের দৈর্ঘ্য ১০০ ফুটের বেশি হওয়া চলবে না।
যাত্রী নিরাপত্তা: পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণের জন্য বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার, পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয় রিং এবং ফায়ার এক্সটিংগুইশার (অগ্নি-নির্বাপক যন্ত্র) রাখতে হবে। রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করাও বাধ্যতামূলক। যাত্রীদের করণীয় নিয়মাবলী নৌকার দৃশ্যমান স্থানে টানিয়ে রাখতে হবে এবং ভ্রমণের আগেই তা পড়ে শোনাতে হবে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার টাঙ্গুয়ার হাওর কেবল পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি হাজারো প্রজাতির মাছ, জলজ উদ্ভিদ এবং শীতকালের পরিযায়ী পাখিদের প্রধান নিরাপদ আশ্রয়স্থল। তবে বিগত কয়েক বছর ধরে মাত্রাতিরিক্ত পর্যটন, অপরিকল্পিত হাউসবোটের বিস্তার, প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা এবং গভীর রাতে উচ্চশব্দে গান বাজানোর কারণে এখানকার জলজ ইকোসিস্টেম চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
পরিবেশবিদ ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, জেলা প্রশাসনের এই সময়োপযোগী ও কঠোর অবস্থান হাওরের বিপন্ন পরিবেশকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে এবং একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।
মন্তব্য