জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৬ এএম

শরীয়তপুরের সখিপুরে সাত মাসের এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে ধর্ষণচেষ্টার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ছাত্রদল নেতা মিলন ঢালীর বিরুদ্ধে। উপজেলার চরকুমারিয়া ইউনিয়নের ঢালী কান্দি এলাকায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় সখিপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে ঘটনার পর থেকে মামলা তুলে নিতে ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্রমাগত প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ভুক্তভোগী পরিবারটি।
পুলিশ, ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সখিপুর থানার ঢালী কান্দি গ্রামের মৃত গনি উকিলের সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে আইরিন লাবনী (২৩) শারীরিক ও শারীরিক পরিচর্যার সুবিধার জন্য বাবার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। অভিযুক্ত মিলন ঢালী (৩৩), যিনি স্থানীয় আক্কাস ঢালীর ছেলে এবং চরকুমারিয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহ-সভাপতি হিসেবে পরিচিত, দীর্ঘদিন ধরে তাকে উত্ত্যক্ত এবং বিভিন্ন কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। পরিবার ও স্থানীয় মুরুব্বিরা একাধিকবার মিলনকে সতর্ক করলেও তিনি নিজের আচরণ থেকে সরে আসেননি।
গত ৫ আগস্ট দুপুরে আইরিন বাড়িতে একা থাকার সুযোগে মিলন ঢালী তার ঘরে অনধিকার প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে তিনি আইরিনকে জড়িয়ে ধরে শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের চেষ্টা চালান। আইরিন আত্মরক্ষার্থে চিৎকার শুরু করলে অভিযুক্ত মিলন তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। পরে আশপাশের লোকজন এগোতে থাকলে মিলন ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল থেকে কেটে পড়েন।
পরবর্তীতে স্থানীয়দের সহায়তায় আহত অবস্থায় ওই গর্ভবতী নারীকে উদ্ধার করে ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা নেওয়ার পর ৯ আগস্ট ভুক্তভোগীর মা নাজমা বেগম বাদী হয়ে সখিপুর থানায় মিলন ঢালী ও তার সহযোগী আনোয়ার ঢালীর (৩৬) বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলা দায়েরের পর থেকেই ভুক্তভোগীর পরিবারকে অব্যাহত হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন অভিযুক্ত ও তার অনুসারীরা। গত ১১ আগস্ট দুপুরে অভিযুক্ত মিলন ফোন করে পরিবারটির ওপর পেট্রোল বোমা মেরে ঘরবাড়ি উড়িয়ে দেওয়া এবং সবাইকে হত্যার হুমকি দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভয়ের মুখে পড়ে গত এক সপ্তাহ ধরে ভুক্তভোগী নারী ও তার পরিবার নিজেদের বাড়ি ছেড়ে আত্মীয়দের বাড়িতে ফেরারী জীবনযাপন করছেন।
কণ্ঠ ভেজা কণ্ঠে ভুক্তভোগী আইরিন লাবনী বলেন:
“আমি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। মায়ের একটু সহায়তার জন্য বাবার বাড়ি এসেছিলাম। কিন্তু ঘরে একা পেয়ে মিলন আমার ওপর আক্রমণ চালায়। এখন বিচার চাওয়াটাই যেন আমাদের অপরাধ হয়েছে। মামলা তুলে নিতে ফোন করে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা কার কাছে যাব? কার কাছে বিচার পাব?”
মামলার বাদী ও ভুক্তভোগীর মা নাজমা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার স্বামী নেই, দেখার কেউ নেই। মামলা করার পর এখন নিজেদেরই পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হওয়ায় এলাকার কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায় না। মেয়েটাকে যে আঘাত করা হয়েছে, তাতে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন তার সুস্থ হতে দীর্ঘ সময় লাগবে। আমি সরকারের কাছে সুবিচার ও পরিবারটির সার্বিক নিরাপত্তা চাই।”
ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে স্থানীয় মাতবর ওয়াসিম ঢালী জানান, মিলন রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে এলাকায় দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। অন্তঃসত্ত্বা নারীর ওপর এমন হামলার ঘটনায় তিনি অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। অপর এক বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন সরদার বলেন, মিলন একজন মাদকসেবী এবং এলাকায় নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার না করায় এলাকাবাসী অসন্তোষ প্রকাশ করছে।
এদিকে, আত্মগোপনে থাকা অভিযুক্ত মিলন ঢালী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ভিডিও বার্তায় তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, ভুক্তভোগীর ভাইয়ের কাছে তিনি অর্থ পান, সেই ধারের টাকা চাইতে গিয়েই কেবল কথা কাটাকাটি হয়েছিল; ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।
বাংলাদেশ ছাত্রদলের জেলা আহ্বায়ক এইচ এম জাকির হোসেন এ বিষয়ে জানান, ওই এলাকায় ছাত্রদলের বৈধ কোনো কমিটি নেই। দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ অপরাধ করলে তার দায় সংগঠন নেবে না। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি কোনো পদে যুক্ত থাকলে তার বিরুদ্ধে খোঁজ নিয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সখিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোফাজ্জল হুসাইন মামলার বিষটি নিশ্চিত করে বলেন, “ভুক্তভোগীর মায়ের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ধর্ষণচেষ্টার মামলা রুজু করা হয়েছে এবং মামলার নথি আদালতে পাঠানো হয়েছে। প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তারে পুলিশের জোর অভিযান চলছে। পরিবারটিকে হুমকির বিষয়ে অভিযোগ পেলে নতুন করে তদন্তসাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
মন্তব্য