বিশ্বব্যাপী কার্যক্রম পরিচালনাকারী বাংলাদেশি শিপিং কোম্পানি ও এয়ারলাইনসগুলোর জন্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় নতুন সুবিধা চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে এসব প্রতিষ্ঠান তাদের ফরেন কারেন্সি (এফসি) বা বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবের উদ্বৃত্ত অর্থ অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকে সুদ বা মুনাফাবহনকারী মেয়াদি আমানত হিসেবে সংরক্ষণ করতে পারবে। এর ফলে আগে অলস পড়ে থাকা বৈদেশিক মুদ্রা থেকে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলো।
রোববার (২৪ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহকে আরও শক্তিশালী করা, প্রবাসী আয়ের মতো আন্তর্জাতিক আয়কে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে ধরে রাখা এবং বৈদেশিক আয় দেশে আনতে উৎসাহ দেওয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনাকারী স্থানীয় শিপিং অপারেটর ও এয়ারলাইনসগুলো তাদের বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবের উদ্বৃত্ত অর্থ সংশ্লিষ্ট এডি ব্যাংকে অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রায় সুদ বা মুনাফাবহনকারী নবায়নযোগ্য এফসি টার্ম ডিপোজিট হিসেবে রাখতে পারবে। এসব মেয়াদি আমানতের মেয়াদ বা সময়সীমা প্রচলিত ব্যাংকিং নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানিয়েছে, এ ধরনের আমানতের ওপর সুদ বা মুনাফার হার নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো। এটি ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্ক এবং বাজার পরিস্থিতির ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। তবে অর্জিত সুদ বা মুনাফা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করা যাবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, সুদ বা মুনাফার অর্থ তৎকালীন স্পট রেট বা চলতি বিনিময় হার অনুসারে বাংলাদেশি টাকায় পরিশোধ করতে হবে।
এর আগে ২০২৩ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সার্কুলারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী স্থানীয় শিপিং কোম্পানি ও এয়ারলাইনসগুলোর জন্য সক্রিয় এফসি হিসাব খোলার অনুমতি দেয়। সেই নীতিমালার আওতায় এসব প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক পরিচালন ব্যয় মেটানোর জন্য বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব পরিচালনা করতে পারত। তবে ওই সময় উদ্বৃত্ত বৈদেশিক মুদ্রা থেকে কোনো ধরনের বিনিয়োগ সুবিধা বা আর্থিক মুনাফা অর্জনের সুযোগ রাখা হয়নি।
ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের হিসাবেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে থাকত। নতুন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেই অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যে রেখে আয় করার সুযোগ তৈরি হলো। এতে বৈদেশিক মুদ্রার কার্যকর ব্যবহার বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের মেরিটাইম ও অ্যাভিয়েশন খাতের কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। আন্তর্জাতিক রুট, কার্গো পরিবহন, যাত্রীসেবা এবং বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের কারণে এই দুই খাতের বৈদেশিক আয়ের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন এই নীতিগত সুবিধা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের অফশোর বা আন্তর্জাতিক আয় আরও বেশি পরিমাণে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে আনতে উৎসাহিত করতে পারে।
এছাড়া ব্যাংকিং খাতে বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার মধ্যে থাকলে তা দেশের বৈদেশিক লেনদেন ও রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলারে আরও স্পষ্ট করেছে যে, ২০২৩ সালের সার্কুলারে উল্লেখিত অন্যান্য সব নির্দেশনা, শর্ত ও পরিচালন পদ্ধতি আগের মতোই বহাল থাকবে। নতুন সুবিধা শুধুমাত্র উদ্বৃত্ত বৈদেশিক মুদ্রাকে সুদ বা মুনাফাবহনকারী মেয়াদি আমানতে রূপান্তরের সুযোগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
একই সঙ্গে অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন এই নতুন সুবিধা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সব গ্রাহক প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত অবহিত করে এবং প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সহায়তা নিশ্চিত করে।
