ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আশ্বস্ত করলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর

বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ’—এর আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষার বিষয়ে সম্পূর্ণ আশ্বস্ত করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই এবং তাদের অর্থ উত্তোলন করতে কোনো প্রকার অসুবিধা হবে না। গ্রাহকেরা যেকোনো সময় ব্যাংকটি থেকে নিজেদের টাকা তুলতে পারবেন।

গত শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে গভর্নর এই মন্তব্য করেন। উক্ত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পাশাপাশি সরকারের ১০ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে দেশের ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক আস্থার সংকট, গ্রাহকদের টাকা না পাওয়া এবং বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উত্থাপিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের বিশদ जवाब দেন গভর্নর। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ইসলামী ব্যাংকের জন্য জরুরি তারল্যসহায়তা বা ইমার্জেন্সি লিকুইডিটি সাপোর্ট হিসেবে যা কিছু দেওয়ার প্রয়োজন, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রদান করা হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি পদক্ষেপ ও জরুরি তারল্যসহায়তা

ইসলামী ব্যাংকের বিদ্যমান পরিস্থিতি ও গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব কিছু আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক টুলস বা পদ্ধতি রয়েছে, যা আমরা আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ব্যাংকটির ওপর প্রয়োগ করতে যাচ্ছি। এই পদক্ষেপগুলোর ফলে আমানতকারীদের কোনো ধরনের অসুবিধা পোহাতে হবে না এবং তারা নির্বিঘ্নে যেকোনো সময় তাদের জমা করা টাকা তুলতে সক্ষম হবেন।’

ব্যাংক খাতের বর্তমান परिस्थितीत ইসলামী ব্যাংকের মতো একটি বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সচল ও স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তারল্যসংকট দূর করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। ব্যাংকটির স্বাভাবিক লেনদেন প্রক্রিয়া বজায় রাখতে এবং এটিএম বুথসহ শাখাগুলোতে নগদ টাকার সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় সমূদয় আর্থিক ও প্রশাসনিক নীতিগত সহায়তা দিয়ে যাবে বলে গভর্নর তাঁর বক্তব্যে পুনর্ব্যক্ত করেন।

পরিচালনা পর্ষদ গঠন ও সাম্প্রতিক বিতর্ক

ইসলামী ব্যাংকে পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং সাম্প্রতিক সময়ে এর অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন উঠছে। এই বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল থেকে ব্যাংকটিতে পাঁচ সদস্যের একটি পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব পালন করে আসছিল। তবে পরবর্তীতে কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ার কারণে পর্ষদের একজন সদস্যকে পরিবর্তন বা বদলানো হয়। এর ধারাবাহিকতায় পবিত্র ঈদুল আজহার আগে ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেন।

গভর্নর আরও জানান, যেহেতু ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের আর্থিক খাতের একটি অত্যন্ত বড় ও সিস্টেমিক ব্যাংক এবং দেশের আইনি কাঠামো অনুযায়ী ন্যূনতম পাঁচজন সদস্য ছাড়া ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বা বোর্ড পরিচালনা করা সম্ভব নয়, তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তাৎক্ষণিকভাবে শূন্য পদে নতুন একজনকে নিয়োগ দিতে হয়েছে। মূলত ব্যাংকের আইনি ধারাবাহিকতা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখার স্বার্থেই এই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

ঋণ-আমানত অনুপাত ও আর্থিক সূচকের উদ্বেগ

ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক সূচক ও ঋণ বিতরণের হার নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গভর্নরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ইসলামী ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাত বা এডিআর (Advance-Deposit Ratio) ছিল ৯৩ শতাংশ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই অনুপাত আরও বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৯৭ শতাংশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর জন্য নির্ধারিত এডিআর-এর সর্বোচ্চ সীমা হলো ৯২ শতাংশ। ইসলামী ব্যাংকের এই অনুপাত নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশ উঁচুতে অবস্থান করায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক विषयটিকে গুরুত্বের সাথে দেখছে। গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে (ম্যানেজমেন্ট) এই ঋণ-আমানত অনুপাত দ্রুত নির্ধারিত সীমার মধ্যে নামিয়ে আনার জন্য কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পর্যবেক্ষক নিয়োগ ও চলমান সংকটের প্রেক্ষাপট

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের পর তাকে কেন্দ্র করে ব্যাংকটির ভেতরে ও বাইরে নানামুখী বিতর্ক ও কর্মকর্তা-कर्मचारियोंদের আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। এই উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকটির সার্বিক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সেখানে একজন বিশেষ পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে। গত বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যার অধীনে কেন্দ্রীয় সংস্থাটিরই নির্বাহী পরিচালক মো. আশরাফুল আলমকে ইসলামী ব্যাংকের পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ইসলামী ব্যাংকের এই সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় সংসদেও সরকারি দল বিএনপি এবং প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। এই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়, যার ফলে অনেক গ্রাহক ব্যাংকটি থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা তুলে নেন। একসাথে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের এই চাপের কারণে ব্যাংকটি তীব্র তারল্যসংকটে পড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে এর এটিএম বুথ সেবা এবং বিভিন্ন শাখার দৈনিক নগদ টাকা প্রদানের ওপর। এই বিদ্যমান সংকটকালীন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং গ্রাহকদের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার জরুরি ধার বা আর্থিক সহায়তা চেয়ে আবেদন করেছে।