জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই জুলাই ২০২৬, ১:৫৮ পিএম

দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে নতুন পে স্কেলের মূল প্রস্তাবনায় বড় ধরনের কাটছাঁট ও পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। তীব্র আর্থিক সংকটের কারণে ঘোষিত বা প্রস্তাবিত কাঠামোটি একবারে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন ও ভাতার সুবিধাসমূহ ধাপে ধাপে কার্যকর করার বিষয়ে নীতিগত আলোচনা চলছে।
সোমবার (৬ জুলাই) সচিবালয়ে এই সংক্রান্ত বিষয়ে সচিব কমিটির একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে নতুন পে স্কেলের বিভিন্ন গ্রেডের মূল বেতন (Basic Pay), চিকিৎসা ও বাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়।
Table of Contents
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সোমবারের আলোচনায় পে স্কেলের চূড়ান্ত রূপরেখা নিয়ে কোনো শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। এই জটিল প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে এবং কাটছাঁটের পরিমাণ নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করতে সচিব কমিটির আরও অন্তত দুটি বৈঠকের প্রয়োজন হতে পারে। কমিটির পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সুপারিশমালা তৈরি হওয়ার পর তা অর্থমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হবে। সেখান থেকে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের অনুমোদন পাওয়ার পরই আনুষ্ঠানিক গেজেট বা প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে এই নতুন বেতন কাঠামো কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়, সেটিই এখন সচিব কমিটির মূল চ্যালেঞ্জ। আর এই কারণেই এককালীন বাস্তবায়নের পরিবর্তে তিন ধাপে এটি সম্পন্ন করার ফর্মুলা সামনে এসেছে।
একবারে পে স্কেল বাস্তবায়ন না করে কয়েক দফায় বা ধাপে ধাপে করার ক্ষেত্রে কিছু প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন খোদ সচিব কমিটির সদস্যরা। বিশেষ করে হিসাব রক্ষণ কার্যালয় এবং বেতন নির্ধারণের ডিজিটাল সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনায় একই কর্মচারীর বেতন দফায় দফায় পরিবর্তন করতে গিয়ে বাড়তি শ্রম ও সময়ের প্রয়োজন হবে। তবে এসব সমস্যা যাতে সাধারণ চাকরিজীবীদের ভোগান্তিতে না ফেলে, সেজন্য একটি সহজ নির্দেশিকা সুপারিশমালার সাথে যুক্ত করা হবে।
তবে এই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও একটি বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন পে স্কেল চলতি বছরের ১ জুলাই থেকেই কার্যকর হিসেবে গণ্য করা হবে। অর্থাৎ, আইনিভাবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ১ জুলাই থেকেই নতুন কাঠামোর সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হবেন। কিন্তু বাস্তবে সেই বর্ধিত অর্থ বা বকেয়া (Arrears) সরকার তার তহবিল পরিস্থিতি অনুযায়ী কয়েকটি কিস্তিতে বা ধাপে ধাপে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অ্যাকাউন্টে পরিশোধ করবে।
সচিব কমিটির এক কর্মকর্তা চলমান পরিস্থিতি নিয়ে জানান:
“সচিব কমিটি এখনো তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে পেশ করেনি। আমাদের আরও কিছু প্রযুক্তিগত হিসাব-নিকাশ যাচাই করতে হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এটি এক বা দুই ধাপে দেওয়া কঠিন হতে পারে, তাই প্রয়োজনবোধে তিন ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হচ্ছে।”
এদিকে নতুন অর্থবছর শুরু হয়ে জুলাই মাস চললেও এখনো নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় মাঠ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এক ধরনের সুপ্ত উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। যদিও সরকারের দায়িত্বশীল মহল থেকে বারবার বলা হচ্ছে যে, ১ জুলাই থেকেই এই পে স্কেল কার্যকর ধরা হবে, তবুও দৃশ্যমান প্রজ্ঞাপন না থাকায় মাঠ প্রশাসনের কাজকর্মে এক ধরনের স্থবিরতা ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে কোন গ্রেডে কত শতাংশ বেতন বাড়ছে, ভাতার ক্ষেত্রে কী ধরনের কাটছাঁট হচ্ছে—এইসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর না থাকায় গুঞ্জন ও বিভ্রান্তি বাড়ছে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি অন্ধকারে এবং উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। কর্মরত ব্যক্তিরা বিভিন্ন দাপ্তরিক বা অভ্যন্তরীণ সূত্রে আংশিক তথ্য পেলেও, অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগীরা প্রশাসনের সাথে সরাসরি যুক্ত না থাকায় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য পাচ্ছেন না। নতুন পে স্কেলের কাটছাঁট তাদের মাসিক পেনশন ও চিকিৎসা ভাতায় কেমন প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে তারা ভীষণ চিন্তিত। সাধারণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের এই দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষা এবং উদ্বেগ দূর করতে সরকার দ্রুত চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করবে—এমনটাই এখন সর্বস্তরের প্রত্যাশা।
মন্তব্য