অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ কৃষি অঞ্চলে ইঁদুরের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এখন মহামারীর পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার ফলে কৃষকেরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ইঁদুরগুলো ঘরবাড়ির আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছে এবং বৃহৎ কৃষিজমিতে শস্য ধ্বংস করে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষকেরা ইতোমধ্যে বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ফসল পুনরায় রোপণ করতে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বীজ বপনের পর ইঁদুরনাশক মিশ্রিত বীজ ছড়িয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার মিনজেনিউপ এলাকায় ১৪ হাজার হেক্টর জমির একটি বড় খামার পরিচালনাকারী ৪৩ বছর বয়সী একজন কৃষক জানান, শুধু ইঁদুরনাশকের ব্যয়ই নয়, এর সঙ্গে মানসিক চাপও অত্যন্ত বেশি। তিনি বলেন, ইঁদুরগুলো রাতে ঘরের ছাদ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে চলাচল করে, তাদের শব্দ ও দুর্গন্ধ অত্যন্ত অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে।
তিনি ২৫ বছর ধরে কৃষিকাজ করছেন এবং জানান, বর্তমান পরিস্থিতি ২০২১ সালের ইঁদুর উপদ্রবের তুলনায় আরও ভয়াবহ। ২০২১ সালে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস ও কুইন্সল্যান্ডে ব্যাপক ইঁদুরের আক্রমণে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছিল, এমনকি কিছু স্থানে কারাগারের ভেতরেও ইঁদুর প্রবেশ করে ব্যাপক সমস্যা তৈরি করেছিল।
বর্তমানে পরিস্থিতি পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় শুরু হয়ে পরে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়াতেও ছড়িয়ে পড়েছে। মার্চ মাস থেকে ইঁদুরের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে বলে জানা যায়।
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার একটি সাড়ে পাঁচ হাজার হেক্টর খামারের একজন কৃষি বিশেষজ্ঞ ও কৃষক জানান, পাঁচ বছর আগের মহামারীর তুলনায় এবারের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। তিনি উল্লেখ করেন, গত বছর রেকর্ড ফসল উৎপাদনের পর জমিতে প্রচুর শস্য পড়ে থাকে, যা ইঁদুরের জন্য সহজ খাদ্যে পরিণত হয়। এরপর গ্রীষ্মে বৃষ্টিপাত হওয়ায় নতুন সবুজ গাছপালাও তাদের খাদ্য হিসেবে যুক্ত হয়, ফলে তাদের বেঁচে থাকার পরিবেশ আরও অনুকূল হয়ে ওঠে।
তিনি জানান, কোথাও কোথাও প্রতি হেক্টর জমিতে হাজার হাজার ইঁদুরের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। কিছু এলাকায় পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, কৃষকেরা বীজ বপনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইঁদুরের কারণে ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থার একজন গবেষক, যিনি ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, তিনি বলেন, সাধারণভাবে প্রতি হেক্টরে আটশোর বেশি ইঁদুর থাকলেই তাকে মহামারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বর্তমানে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার কিছু অঞ্চলে প্রতি হেক্টরে কয়েক হাজার ইঁদুর দেখা যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, কিছু এলাকায় একশ মিটার জায়গার মধ্যেই ত্রিশ থেকে চল্লিশটি সক্রিয় গর্ত পাওয়া গেছে, যা ব্যাপক বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়।
কৃষকেরা জানিয়েছেন, বীজ রোপণের পর দ্রুত ইঁদুরনাশক প্রয়োগ না করলে রাতারাতি ফসলের সারি নষ্ট হয়ে যায়। একই সঙ্গে জ্বালানি ও সারসহ কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।
ইঁদুর উপদ্রবের পরিস্থিতিগত তুলনা
| বিষয় | পূর্ববর্তী অবস্থা (২০২১) | বর্তমান অবস্থা |
|---|---|---|
| প্রধান অঞ্চল | নিউ সাউথ ওয়েলস, কুইন্সল্যান্ড | পশ্চিম ও দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া |
| ক্ষতির ধরন | ফসল ও অবকাঠামো ক্ষতি | ফসল ধ্বংস, বীজ নষ্ট |
| ইঁদুরের ঘনত্ব | মহামারী পর্যায় | প্রতি হেক্টরে কয়েক হাজার পর্যন্ত |
| পরিবেশগত কারণ | অনুকূল আবহাওয়া | রেকর্ড ফসল ও বৃষ্টিপাত |
| প্রভাবের মাত্রা | ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি | আরও তীব্র ও বিস্তৃত ক্ষতি |
কৃষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যের সহজলভ্যতা এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ইঁদুরের প্রজনন ও বেঁচে থাকার হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যা কৃষি উৎপাদনের জন্য বড় হুমকি তৈরি করেছে।
