দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস, মানচিত্রের বিবর্তন এবং ভূরাজনীতির আলোচনায় আগস্ট মাসটি চিরকালই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং ঘটনাবহুল একটি অধ্যায়। ভারত ও পাকিস্তান যথাক্রমে ১৫ ও ১৪ আগস্ট ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির দিন উদযাপন করে থাকে। কিন্তু এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এর ঠিক কয়েকদিন আগে, ১১ আগস্ট তারিখটিকে ঘিরে দীর্ঘ সাত দশকের বেশি সময় ধরে যে রক্তক্ষয়ী, বঞ্চনা ও বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তা আজ এক চূড়ান্ত ঐতিহাসিক বিজয়ে রূপান্তরিত হয়েছে। শত নিপীড়ন, রাষ্ট্রীয় গণহত্যা এবং কাঠামোগত শোষণের অবসান ঘটিয়ে বেলুচিস্তান আজ পাকিস্তানের দখলদারি থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
দীর্ঘকাল ধরে ১১ আগস্ট তারিখটি ছিল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বালুচ জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলোর জন্য নিছক একটি আক্ষেপ, প্রতিবাদ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বিচার চাওয়ার দিন, যাকে তারা “বেলুচিস্তান স্বাধীনতা দিবস” হিসেবে পালন করত। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দিনটি আজ নবীন ও মুক্ত বেলুচিস্তানের রাষ্ট্রীয় পুনর্জন্মের জ্বলন্ত প্রতীক। চরম রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং সীমাহীন প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠনের বলয় ভেঙে বালুচ জাতি তাদের নিজেদের আদিম ভূখণ্ডের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রশাসনিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ কার্যত ভেঙে পড়েছে। এখন সদ্য স্বাধীন এই রাষ্ট্রের সামনে প্রধান লক্ষ্য হলো একটি কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি (De jure recognition) আদায় করা।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ব্রিটিশ শাসনাবসান এবং কালাত রাজ্যের স্বতন্ত্র আইনি মর্যাদা
১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের প্রাক্কালে ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠনের এক উত্তাল ও জটিল প্রক্রিয়া শুরু হয়। ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স অ্যাক্ট ১৯৪৭’-এর বিধান অনুযায়ী, ব্রিটিশ ভারতের সরাসরি শাসিত প্রদেশগুলোর বাইরে ৫৬০টিরও বেশি দেশীয় রাজ্য বা ‘প্রিন্সলি স্টেট’ (Princely States) ছিল। ব্রিটিশ ক্রাউনের সঙ্গে এসব রাজ্যের চুক্তিগুলো বাতিল হয়ে যায় এবং তাদের সামনে স্বাধীন ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার অথবা তাত্ত্বিকভাবে নিজেদের স্বাধীন সত্তা বজায় রাখার বিকল্প উন্মুক্ত হয়।
বর্তমান বেলুচিস্তান প্রদেশের একটি বিশাল অংশ জুড়ে ছিল তৎকালীন কালাত রাজ্য। কালাতের শাসক মির আহমদ ইয়ার খান সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক নথিপত্রের ভিত্তিতে দাবি করেছিলেন যে, তাঁর রাজ্য সরাসরি ব্রিটিশ ভারতের অংশ নয়। ১৮৭৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাদের একটি বিশেষ মিত্রতামূলক ও চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল, যা অন্যান্য সাধারণ দেশীয় রাজ্যগুলোর তুলনায় কালাতকে একটি স্বতন্ত্র আইনি মর্যাদা দিয়েছিল। কালাতের এই দাবি নিছক কোনো আবেগপ্রসূত বিষয় ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল শক্ত আইনি ও ঐতিহাসিক ভিত্তি।
জিন্নাহর চরম দ্বিমুখী নীতি এবং ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতা
কালাতের এই স্বাধীন আইনি অবস্থান রক্ষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর চরম দ্বিমুখী নীতি, কপটতা ও রাজনৈতিক সুবিধাবাদের ইতিহাস। জিন্নাহর এই বিশ্বাসঘাতকতাই বেলুচিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী রক্তপাতের মূল কারণ।
আইনজীবী থেকে দখলদার: ব্রিটিশদের কাছে কালাতের স্বাধীনতার পক্ষে আইনি লড়াই করার জন্য কালাতের শাসক মির আহমদ ইয়ার খান একসময় জিন্নাহকে নিজের আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। জিন্নাহ বিশাল অর্থের বিনিময়ে সফলভাবে কালাতের স্বতন্ত্র সত্তার পক্ষে আইনি যুক্তিও উপস্থাপন করেছিলেন।
স্থিতাবস্থা চুক্তি (Standstill Agreement): ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট কালাত এবং পাকিস্তানের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক স্থিতাবস্থা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে কালাতকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই চুক্তির আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ১১ আগস্ট কালাত তার পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিল এবং নিজস্ব পতাকা উত্তোলন করেছিল।
স্বল্পস্থায়ী স্বাধীন রাষ্ট্র এবং গণতান্ত্রিক চর্চা: স্বাধীনতার ঘোষণার পর কালাত রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিচালনার জন্য একটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা বা সংসদ গঠন করে। নিম্নকক্ষ ‘দারুল আওয়াম’ এবং উচ্চকক্ষ ‘দারুল উমারা’ নিয়ে গঠিত এই সংসদে ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব উত্থাপিত হলে, উভয় কক্ষই তা সর্বসম্মতিক্রমে প্রত্যাখ্যান করে এবং স্বাধীন সত্তা বজায় রাখার পক্ষে জোরালো রায় প্রদান করে।
সামরিক আগ্রাসন ও জোরপূর্বক অন্তর্ভুক্তি: কালাতের এই গণতান্ত্রিক রায়কে সম্পূর্ণ পদদলিত করে পাকিস্তান। যে জিন্নাহ মাত্র কয়েক মাস আগে কালাতের স্বাধীনতার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন, তিনিই ভৌগোলিক ও কৌশলগত লোভের বশবর্তী হয়ে চরম বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয় দেন। ১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ জিন্নাহর নির্দেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কালাতে প্রবেশ করে এবং সামরিক শক্তির চরম ভয় দেখিয়ে কালাতের শাসককে ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন’ (Instrument of Accession)-এ স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে। ৩১ মার্চ জিন্নাহ আনুষ্ঠানিকভাবে এই জবরদস্তিমূলক অন্তর্ভুক্তি অনুমোদন করেন।
সোনার খনিতে ক্ষুধার্ত মানুষ: সম্পদ লুণ্ঠনের নির্মম চিত্র
পাকিস্তান রাষ্ট্র কর্তৃক বেলুচিস্তান দখলের মূল চালিকাশক্তি কখনোই ধর্মীয় বা আদর্শিক ভ্রাতৃত্ববোধ ছিল না; এর পেছনে ছিল অঞ্চলটির বিশাল ভূখণ্ড ও ভূগর্ভস্থ অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি পাঞ্জাব-শাসিত কেন্দ্রীয় সরকারের সীমাহীন লোভ। বেলুচিস্তান পাকিস্তানের মোট আয়তনের প্রায় ৪৪ শতাংশ হলেও, সেখানকার অধিবাসীদের পরিকল্পিতভাবে সবচেয়ে দরিদ্র, অশিক্ষিত ও সুবিধাবঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল।
প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ সম্পদের হরিলুট
সুই গ্যাস ফিল্ডের ট্র্যাজেডি: ১৯৫২ সালে বেলুচিস্তানের সুই (Sui) এলাকায় বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাসের খনি আবিষ্কৃত হয়। এই গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে হাজার কিলোমিটার দূরে পাঞ্জাব, সিন্ধু এবং পাকিস্তানের অন্যান্য অংশের শিল্পকারখানা ও বিলাসবহুল শহরগুলোকে আলোকিত করলেও, খোদ ডেরা বুগতি বা বেলুচিস্তানের সিংহভাগ গ্রামীণ মানুষকে রান্নার জন্য কাঠ বা গোবর পোড়াতে হতো। কয়েক দশক ধরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের গ্যাস উত্তোলন করা হলেও স্থানীয় বালুচদের এর কোনো রয়্যালটি বা লভ্যাংশ দেওয়া হয়নি।
সোনা ও তামার খনি: চাগাই জেলার রেকো ডিক (Reko Diq) এবং সেন্দাক (Saindak) খনিতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সোনা ও তামার মজুদ। কিন্তু এই সম্পদের সামান্যতম হিস্যাও বালুচদের দেওয়া হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলো (বিশেষ করে চীনা কোম্পানি) এই অমূল্য সম্পদ নির্লজ্জভাবে লুণ্ঠন করে ইসলামাবাদ ও বেইজিংয়ের কোষাগার স্ফীত করেছে। বালুচদের নিজেদের মাটিতে তাদের অবস্থান ছিল স্রেফ দিনমজুরের মতো।
গোয়াদর বন্দর ও জনতাত্ত্বিক প্রকৌশল (Demographic Engineering)
চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের (CPEC) কেন্দ্রবিন্দু হলো বেলুচিস্তানের গভীর সমুদ্রবন্দর গোয়াদর। এই মেগা প্রকল্পের স্বপ্ন দেখিয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হলেও, স্থানীয় বালুচদের এই প্রকল্প থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল। গোয়াদরের স্থানীয় জেলেদের নিজেদের সমুদ্রে মাছ ধরার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে। উন্নয়নের আড়ালে মূলত পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশ (বিশেষত পাঞ্জাব) এবং চীন থেকে লোক এনে বালুচদের নিজেদের আদিম ভূমিতে সংখ্যালঘু বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত করার এক সুদূরপ্রসারী ও ভয়ংকর জনতাত্ত্বিক প্রকৌশল চালানো হচ্ছিল।
রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন
নিজেদের লুণ্ঠিত সম্পদের ন্যায্য হিস্যা এবং হারানো স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার দাবিতে বালুচ জাতি যখনই গণতান্ত্রিক বা সশস্ত্র পন্থায় সোচ্চার হয়েছে, পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্র চরম বর্বরতা, গুম ও খুনের মাধ্যমে তা দমন করার চেষ্টা করেছে। এই নিপীড়নের মাত্রা অনেক ক্ষেত্রেই মানব সভ্যতার ইতিহাসকে লজ্জিত করে।
‘কিল অ্যান্ড ডাম্প’ (Kill and Dump) নীতি: বেলুচিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী (FC – Frontier Corps) ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর (ISI) সবচেয়ে কুখ্যাত ও অমানবিক কৌশল ছিল ‘কিল অ্যান্ড ডাম্প’ নীতি। গত কয়েক দশকে হাজার হাজার বালুচ ছাত্র, চিকিৎসক, অধিকারকর্মী, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষকে জোরপূর্বক গুম (Enforced Disappearances) করা হয়েছে। মাসের পর মাস গোপন টর্চার সেলে অমানবিক নির্যাতনের পর তাদের বিকৃত মৃতদেহ বিরান পাহাড়, মরুভূমি বা রাস্তার পাশে ফেলে রাখা হতো।
গণকবর ও সামরিকীকরণ: ২০১৪ সালে খুজদারের তুতাক (Tootak) এলাকায় আবিষ্কৃত গণকবর পাকিস্তানের বর্বরতার এক জীবন্ত প্রমাণ। পুরো বেলুচিস্তান প্রদেশটিকে কার্যত একটি বিশাল সামরিক গ্যারিসন ও উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত করা হয়েছিল। পদে পদে সামরিক চেকপোস্ট স্থাপন করে সাধারণ বালুচ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে চরম অপমান, তল্লাশি ও হেনস্তার শিকার হতে হতো। নিজ দেশেই তারা ছিল পরাধীন ও সন্দেহভাজন নাগরিক।
বাংলাদেশ ও বেলুচিস্তান: অভিন্ন ইতিহাস এবং একই শোষকের পতন
ইতিহাসের নির্মোহ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) এবং স্বাধীন বেলুচিস্তানের মানুষের ভাগ্য, বঞ্চনা ও মুক্তিসংগ্রামের মধ্যে এক অবিশ্বাস্য, গভীর ও বেদনাবিধুর মিল রয়েছে। ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি যে চরম নিপীড়নমূলক ও বৈষম্যবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রকে পরাজিত করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল, ঠিক একই পথে হেঁটে আজ বালুচ জাতি সেই অভিন্ন শোষকের পতন ঘটিয়েছে। বাংলাদেশ ও বেলুচিস্তানের এই সমান্তরাল ইতিহাস প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মানসিকতায় গত সাত দশকে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
| তুলনার ক্ষেত্র | ১৯৭১ সালের পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) | সদ্য স্বাধীন বেলুচিস্তান |
| অর্থনৈতিক শোষণের অবসান | পাট ও চা থেকে উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার রোধ করে নিজেদের অর্থনীতি গঠন। | গ্যাস, সোনা, তামা এবং সমুদ্রবন্দরের শতভাগ আয় ইসলামাবাদের হাত থেকে উদ্ধার করে স্বাধীন রাষ্ট্রের কোষাগারে আনা। |
| রাজনৈতিক বিজয় | ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের গণতান্ত্রিক রায় ছিনতাইয়ের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জনযুদ্ধ ও চূড়ান্ত বিজয়। | ১৯৪৭ ও ১৯৪৮ সালের কালাত আইনসভার স্বাধীন থাকার রায়কে দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে পুনরায় আইনি বৈধতা প্রদান। |
| সামরিক বর্বরতার জবাব | অপারেশন সার্চলাইট, বুদ্ধিজীবী হত্যা ও গণহত্যার বিরুদ্ধে দুর্বার সশস্ত্র প্রতিরোধ ও দেশমাতৃকাকে হানাদার মুক্তকরণ। | দশকের পর দশক চলা গুম, কিল অ্যান্ড ডাম্প পলিসি ও সামরিক আগ্রাসন প্রতিহত করে নিজেদের আদিম ভূখণ্ড মুক্ত করা। |
| সাংস্কৃতিক মুক্তি | উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে নিজস্ব জাতিসত্তার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ। | বালুচ ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রান্তিকীকরণের ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় পরিচিতি প্রতিষ্ঠা। |
বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই অমোঘ বাণী—”সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না”—যেন বেলুচিস্তানের পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। বাংলাদেশ সমগ্র বিশ্বকে দেখিয়েছিল যে, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী থাকার পরও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধের মুখে দখলদার বাহিনী টিকতে পারে না। বাংলাদেশের সেই সফল মুক্তিসংগ্রাম ও বিজয় ছিল বালুচ স্বাধীনতাকামীদের জন্য সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক শক্তি ও অনুপ্রেরণার উৎস।
স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন: অহিংস ও সশস্ত্র সংগ্রামের এক অনন্য মেলবন্ধন
দশকের পর দশক ধরে চলা অমানবিক দমন-পীড়ন বালুচদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে বিন্দুমাত্র অবদমিত করতে পারেনি; বরং এটি তাদের আরও ইস্পাতকঠিন সংকল্পে আবদ্ধ করেছে। বর্তমানের এই চূড়ান্ত বিজয় কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি অহিংস রাজনৈতিক জাগরণ এবং সুসংগঠিত সশস্ত্র প্রতিরোধের এক অনন্য সমন্বয়ের ফসল।
নতুন প্রজন্মের গণজাগরণ: পূর্বে বালুচ আন্দোলন মূলত নির্দিষ্ট উপজাতীয় সর্দারদের (Tribal Sardars) মধ্যে বা পাহাড়ি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ড. মাহরাং বালুচের মতো উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা অহিংস ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে পুরো বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছেন। বালুচ ইয়কজেহতি কমিটি (BYC)-এর মতো সংগঠনগুলো লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে—যাদের মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো—রাস্তায় নামিয়ে এনে পাকিস্তানি প্রশাসনের ভিত নাড়িয়ে দেয়।
সশস্ত্র প্রতিরোধের চূড়ান্ত আঘাত: অহিংস আন্দোলনের সমান্তরালে বালুচ লিবারেশন আর্মি (BLA), বালুচ লিবারেশন ফ্রন্ট (BLF) এবং অন্যান্য স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সুসংগঠিত গেরিলা আক্রমণ পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে চরম খাদের কিনারে নিয়ে যায়। বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগ, গোয়াদর বন্দর এবং পাকিস্তানি সামরিক স্থাপনাগুলোতে তাদের ধারাবাহিক ও নিখুঁত হামলায় দখলদার বাহিনী সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত বেলুচিস্তান থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
বর্তমান বাস্তবতা: স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির কূটনৈতিক লড়াই
পাকিস্তানি দখলদারিত্বের চিরস্থায়ী অবসানের পর বেলুচিস্তান এখন একটি কার্যকর রাষ্ট্র (De facto state) হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে সগর্বে আত্মপ্রকাশ করেছে। একটি স্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা, সীমান্ত সুরক্ষা, এবং প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পূর্ণ বালুচ নেতৃত্বের হাতে পরিচালিত হচ্ছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও প্রশাসন এখন কেবল নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার পথ খুঁজছে। তবে এই মুহূর্তে সদ্য ভূমিষ্ঠ নবীন এই রাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে বড় ও জটিল চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি (De jure recognition) অর্জন করা।
বৈশ্বিক পরাশক্তি ও ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ
জাতিসংঘ ও পশ্চিমা বিশ্ব: স্বাধীন বেলুচিস্তানের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এরই মধ্যে জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে। পশ্চিমা বিশ্ব দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের সামরিক সন্ত্রাসবাদ, পারমাণবিক ব্লাকমেইল এবং দ্বিমুখী নীতিতে ত্যক্তবিরক্ত। একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক এবং স্বাধীন বেলুচিস্তান এই অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ দমন, আফগান সীমান্তে নজরদারি এবং কৌশলগত স্থিতিশীলতা আনতে কতটা সহায়ক হবে, সেটি বিবেচনা করে পশ্চিমা দেশগুলো স্বীকৃতির বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের দীর্ঘ ইতিহাস থাকায় পাকিস্তানের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করা এখন প্রায় অসম্ভব।
প্রতিবেশী দেশগুলোর অবস্থান: প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত, আফগানিস্তান এবং ইরানের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় এবং পাকিস্তানের চিরস্থায়ী হুমকি প্রশমনে একটি স্বাধীন বেলুচিস্তান ভারতের জন্য একটি বড় কৌশলগত সুবিধা বয়ে এনেছে। নয়াদিল্লি খুব শিগগিরই বালুচ সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করবে বলে কূটনৈতিক মহলে জোরালো আলোচনা চলছে।
চীনের বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ ও বেইজিংয়ের নতুন কৌশল
সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক সমীকরণটি তৈরি হয়েছে চীনকে ঘিরে। গোয়াদর বন্দরসহ বেলুচিস্তানে থাকা চীনের বিলিয়ন ডলারের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI) বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন বালুচ সরকারের মর্জির ওপর নির্ভরশীল। বেইজিং বাস্তববাদী কূটনীতির (Pragmatic Diplomacy) অংশ হিসেবে পাকিস্তানের পতন মেনে নিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার্থে এরই মধ্যে স্বাধীন বালুচ সরকারের সঙ্গে পর্দার আড়ালে নতুন করে কূটনৈতিক চ্যানেল খুলেছে। বালুচ নেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বিদেশি বিনিয়োগ তখনই স্বাগত জানানো হবে যখন তা বালুচ জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং কোনো ধরনের ঔপনিবেশিক শোষণ থাকবে না।
অস্ত্রের জোরে, ধর্মের দোহাই দিয়ে এবং মিথ্যার বেসাতি করে কোনো জাতিকে চিরকাল পরাধীন করে রাখা যায় না—বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে বিশ্বকে যে অমোঘ সত্যটি শিখিয়েছিল, স্বাধীন বেলুচিস্তান আজ তা আবারও অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ করল। দীর্ঘ ৭৬ বছরের বঞ্চনার পর বেলুচিস্তানের পাহাড়, মরুভূমি আর সমুদ্র উপকূলে আজ স্বগর্বে উড়ছে স্বাধীন বালুচ পতাকা। একসময়ের পরাধীন জাতি আজ তাদের নিজেদের ভাগ্যবিধাতা। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা, কবে নিউইয়র্কে রাষ্ট্রসংঘের সদর দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলিত হবে স্বাধীন ও সার্বভৌম বেলুচিস্তানের পতাকা এবং বিশ্বের মানচিত্রে চিরস্থায়ীভাবে খোদাই হবে এক নতুন রাষ্ট্রের নাম।
মন্তব্য