ইউক্রেনের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো লক্ষ্য করে রাতভর ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) ভোররাত থেকে শুরু হওয়া এই সমন্বিত আক্রমণে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, গ্রিড এবং সাবস্টেশনগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই হামলাকে রাশিয়ার ‘শীতকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের’ একটি অংশ হিসেবে অভিহিত করেছেন। যুদ্ধের চার বছর অতিক্রান্ত হওয়ার এই সন্ধিক্ষণে এমন বিধ্বংসী হামলা ইউক্রেনের বিপর্যস্ত বিদ্যুৎ খাতকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে।
Table of Contents
হামলার ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানান, রুশ বাহিনী শনিবার ভোররাতে ৪০০-এর বেশি কামিকাজে ড্রোন এবং অন্তত ৪০টি বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে এই আক্রমণ পরিচালনা করেছে। ইউক্রেনের জ্বালানিমন্ত্রী ডেনিশ শমিহাল জানিয়েছেন, হামলার মূল লক্ষ্য ছিল দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রসমূহ। বিশেষ করে বুরশতিন ও দব্রোৎভির তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র দুটিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ বিতরণের প্রধান সাবস্টেশন ও ট্রান্সমিশন লাইনগুলোতে আঘাত হানার ফলে পুরো দেশজুড়ে জরুরিভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।
ইউক্রেনের ওপর চালানো সাম্প্রতিক হামলার পরিসংখ্যান ও প্রভাব:
| হামলার মাধ্যম | সংখ্যা/বিবরণ | প্রধান লক্ষ্যবস্তু |
| কামিকাজে ড্রোন | ৪০০টিরও বেশি | বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও সাবস্টেশন |
| ক্ষেপণাস্ত্র | প্রায় ৪০টি | ট্রান্সমিশন লাইন ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র |
| আক্রান্ত প্রধান অঞ্চল | খমেলনিৎস্কাইয়ে, রিভনে, লভিভ | পশ্চিমাঞ্চলীয় কৌশলগত গ্রিড |
| আবহাওয়ার পরিস্থিতি | হিমাঙ্কের নিচে ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস | জনজীবনে বিপর্যয় ও হিটিং সিস্টেম বন্ধ |
| জরুরি পদক্ষেপ | পোল্যান্ড থেকে বিদ্যুৎ আমদানি | জাতীয় গ্রিডের স্থিতিশীলতা রক্ষা |
‘শীতকে অস্ত্র’ করার অভিযোগ
সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় ভলোদিমির জেলেনস্কি ক্রেমলিনের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, রাশিয়া কূটনীতির ভাষা ভুলে গিয়ে এখন হামলাকেই একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসের এই হাড়কাঁপানো শীতে ইউক্রেনীয়দের মনোবল ভেঙে দিতেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে ইউক্রেনের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরবাড়ি উষ্ণ রাখার ব্যবস্থা বা ‘হিটিং সিস্টেম’ অকেজো হয়ে পড়ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে।
জাতীয় গ্রিডের বিপর্যয় ও বিকল্প ব্যবস্থা
জ্বালানিমন্ত্রী শমিহাল নিশ্চিত করেছেন যে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউক্রেন সরকার পোল্যান্ড থেকে জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করেছে। রাশিয়ার এই কৌশলগত হামলার উদ্দেশ্য হলো ইউক্রেনীয়দের অন্ধকারের পাশাপাশি প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা। তবে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ কর্মীরা জীবন ঝুঁকি নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো মেরামতের কাজ শুরু করেছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মস্কো এই নির্দিষ্ট হামলা নিয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি, যদিও তারা নিয়মিতভাবে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোকে বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দাবি করে আসছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
রাশিয়ার এই ব্যাপক হামলা ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং মিত্র দেশগুলোর সাহায্যের প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দিলেও রাশিয়ার ড্রোনের ঝাঁক এবং ক্ষেপণাস্ত্রের বিচিত্রতা মোকাবিলা করা কিয়েভের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মুহূর্তে ইউক্রেনের প্রধান লক্ষ্য হলো শীতকালীন বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে জাতীয় গ্রিডকে সচল রাখা এবং পোল্যান্ডের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে জ্বালানি সংযোগ সুদৃঢ় করা।
