জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ই জুলাই ২০২৬, ৮:৪৭ এএম

বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় সরকারি অর্থায়নে নির্মিত একটি সেতুর ঢালাইয়ের কাজ চলাকালেই তা খালের মধ্যে ধসে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পটির কাজ চলাকালীন এমন বিপর্যয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর থেকে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং তদারকির অভাব নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা চলছে।
দুর্ঘটনার বিবরণ ও বর্তমান পরিস্থিতি
ঘটনাটি ঘটেছে গৌরনদী উপজেলার খাঞ্জাপুর ইউনিয়নের দূরবর্তী আহম্মেদকাঠী গ্রামের মৃধাবাড়ির সামনের খালে। সরেজমিনে প্রাপ্ত তথ্য ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার (২২ জুলাই) দুপুরে বৃষ্টি চলাকালীন সময়ে সেতুটির ওপরের কংক্রিটের ঢালাইয়ের কাজ শুরু করা হয়। ঢালাই চলাকালেই আকস্মিকভাবে সাটারিংসহ সেতুর একটি বিরাট অংশ খালের মধ্যে ধসে পড়ে।
পরদিন বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিকেলে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণাধীন সেতুটির প্রায় অর্ধেক অংশ ভেঙে খালের পানির মধ্যে পড়ে রয়েছে। ধসের ফলে সেতুর বাঁকি অংশের সদ্য দেওয়া ঢালাইও প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ধুয়ে-মুছে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিকরা জানান, ঢালাই শেষ করার পরপরই বৃষ্টি শুরু হয় এবং সাটারিং চাপ সহ্য করতে না পেরে পুরো অবকাঠামো ভেঙে পড়ে। এ সময় কাজের দায়িত্বে থাকা দুজন শ্রমিক অল্পের জন্য প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পান।
অনিয়ম ও নিম্নমানের উপকরণের অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন যে, সেতুটি নির্মাণের শুরু থেকেই ব্যাপক অনিয়ম ও অবহেলা করা হচ্ছিল। বিশেষ করে সাটারিং তৈরির কাজে পুরোনো, ঘুনে ধরা ও নিম্নমানের বাঁশ এবং দুর্বল কাঠ-পাটাতন ব্যবহার করা হয়েছে। জলের ওপর উপযুক্ত ও মজবুত সাপোর্টিং স্ট্রাকচার না করেই তড়িঘড়ি করে ঢালাইয়ের কাজ করা হচ্ছিল। ভিজে থাকা কাঁচা ও দুর্বল বাঁশের ওপর ভারী কংক্রিটের লোড দেওয়ার কারণেই এই ধসের ঘটনা ঘটে।
ঠিকাদার ও সরকারি দপ্তরের বক্তব্য
গৌরনদী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অর্থায়নে মোট ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দে এই সেতুটি নির্মিত হচ্ছিল। কাজটি বাস্তবায়নের জন্য আনুষ্ঠানিক দরপত্র পেয়েছিল ‘ডায়নামিক আইটি শপ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে তারা নিজেরা সরাসরি কাজ না করে ঠিকাদার আবুল ফয়েজ শরীফের কাছে কাজটি বিক্রি বা হস্তান্তর করে। আবুল ফয়েজ শরীফই মাঠপর্যায়ে সেতুর নির্মাণকাজ পরিচালনা করছিলেন।
ঘটনার বিষয়ে সাব-ঠিকাদার আবুল ফয়েজ শরীফ নিজের ভুল স্বীকার করে বলেন, “নিচের স্ট্রাকচার শক্ত ও মজবুত না থাকায় ঢালাই শুরু করার পরপরই সাটারিং ভেঙে পড়েছে। অতিদ্রুত নতুন করে মজবুত সাটারিং তৈরি করে পুনরায় ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন করা হবে।”
অন্যদিকে, তদারকি ও সম্মতির বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হলে গৌরনদী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) খোকন চন্দ্র দাস বলেন, “ঠিকাদার সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা আমাদের কাউকে না জানিয়ে কিংবা তদারকি কর্মকর্তা ছাড়াই স্বউদ্যোগে ঢালাইয়ের কাজ শুরু করেছিলেন। ধসে পড়ার বিষয়টি জানার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত অবহিত করা হয়েছে। তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইব্রাহীম স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে কাজের গুণগত মান বা নির্মাণসামগ্রীতে কোনো অনিয়ম প্রমাণ হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সাথে সরকারের কোনো আর্থিক ক্ষতি না করে ঠিকাদারের নিজ খরচে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মানসম্মতভাবে পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
জনস্বার্থ ও স্থানীয়দের দাবি
একটি গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং এলাকাবাসীর চলাচলের সুবিধার্থে সরকারি অর্থে এই সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছিল। কিন্তু শুরুতেই এমন ধসের কারণে সরকারি অর্থের অপচয় এবং কাজের স্থায়িত্ব নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে সাব-ঠিকাদারি প্রথা, অনিয়ম ও গাফিলতির সাথে জড়িতদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
মন্তব্য