খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ই জুলাই ২০২৬, ৮:৫৩ পিএম

বাবার দাফনের কাফন শুকানোর আগেই গভীর রাতে ব্যাংকের এটিএম বুথ পাহারা দিতে হয়েছিল তাকে। পেটের তাগিদ আর সংসারের টানপোড়েন ইসমাইল ইকনকে সেই রাতে শোক প্রকাশের সুযোগটুকুও দেয়নি। কিন্তু শত প্রতিকূলতা জয় করে পরদিনই বসেছিলেন এইচএসসি পরীক্ষার হলে। এক তরুণ শিক্ষার্থীর এই অদম্য লড়াইয়ের কথা প্রকাশ্যে আসতেই আলোড়ন সৃষ্টি হয় দেশজুড়ে। এবার সেই সংগ্রামী শিক্ষার্থী ইকনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে তাকে এক লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা এবং বেতনসহ এক মাসের ছুটি দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের বিশেষ নির্দেশনায় ইকনের হাতে সহায়তার এই অর্থ তুলে দেওয়া হয়। খুলনার বিভাগীয় কার্যালয়ের মহাব্যবস্থাপক মো. আবু হাশেম মিয়া সরেজমিনে উপস্থিত হয়ে ব্যাংকের পক্ষে এই অর্থ প্রদান করেন। কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও দায়িত্ববোধ ও শিক্ষার প্রতি একাগ্রতা ধরে রাখায় ইকনের প্রশংসা করেন ব্যাংক কর্মকর্তারা।
বাগেরহাট শহরের মুনিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ইসমাইল ইকনের জীবনে নেমে আসা হঠাৎ ঝড় পুরো পরিবারকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যে ঠেলে দিয়েছিল। গত মঙ্গলবার (২২ জুলাই) সকালে তার বাবা ইসরাফিল ডাড়িয়া হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হঠাৎ মারা যান। পরিবারে উপার্জনের আর কেউ ছিল না। অসুস্থ ও মানসিক ভারসাম্যহীন এক ভাই এবং মাকে নিয়ে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন ইকন। ওই দিন বিকেলেই বাগেরহাটে বাবার দাফন সম্পন্ন হয়। শোকবিহ্বল ইকন পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম চিন্তায় পড়ে যান।
সংসারের খরচ চালানো ও পড়াশোনা টিকিয়ে রাখতে চলতি বছরের মে মাস থেকেই বাগেরহাট শহরের একটি কৃষি ব্যাংক এটিএম বুথে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে নাইট ডিউটি শুরু করেন ইকন। এর আগে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে তিনি স্থানীয় শিশুদের টিউশনি করাতেন। বাবার দাফন শেষ হওয়ার পর বিষাদগ্রস্ত মন নিয়ে মঙ্গলবার রাতেই তাকে ছুটতে হয় এটিএম বুথের নাইট ডিউটিতে। সারা রাত বুথ পাহারার দায়িত্ব পালন শেষে চোখের পানি মুছে বুধবার সকালে সরাসরি চলে যান পরীক্ষার হলে। সরকারি পিসি কলেজ কেন্দ্রে বসে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে অংশ নেন এইচএসসি পরীক্ষায়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে ইকনের এই নিঃশব্দ সংগ্রামের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশ-বিদেশের বহু মানবিক মানুষ তার পাশে দাঁড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন। ইকনের এমন একনিষ্ঠতা ও মানসিক শক্তির গল্প ছুঁয়ে গেছে সর্বস্তরের মানুষকে। জীবনের এই কঠিন সময়ে কৃষি ব্যাংকের তাৎক্ষণিক এই সহায়তা তার পরিবারের জন্য বড় এক স্বস্তি নিয়ে এসেছে।
সহায়তা হস্তান্তরের পর ইকন তার অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়ে কৃষি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, গণমাধ্যম কর্মী এবং দেশ-বিদেশের শুভানুধ্যায়ীরা যেভাবে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, তা আমি কখনো ভুলব না। এই ঋণ শোধ করার মতো নয়। প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে পরিবারের জরুরি বকেয়া মেটানো এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কিছুটা হলেও সহজ হবে বলে জানান তিনি।
বাবার আকস্মিক প্রয়াণ ও সীমাহীন আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ইকনের এই অদম্য মানসিকতা আজ বহু তরুণের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। কঠিন মুহূর্তে প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের ভালোবাসাকে সঙ্গী করে নিজের আলোকিত ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখছেন এই তরুণ শিক্ষার্থী।
মন্তব্য