খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ই জুলাই ২০২৬, ৩:৫৮ পিএম

বাংলাদেশ জাতীয় টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক লিটন কুমার দাসকে বোর্ডের অনুমতি ও যথাযথ অবহিতকরণ ছাড়াই চীন সফরের ঘটনায় জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) আচরণবিধি ও কেন্দ্রীয় চুক্তির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে রোববার তাকে শৃঙ্খলা কমিটির শুনানিতে ডাকা হয়। শুনানিতে লিটন নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। এখন তার বক্তব্য, শারীরিক অবস্থা এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে বোর্ড।
ঘটনাটি সামনে আসে জিম্বাবুয়ে সফর শেষে লিটনের দেশে ফেরার পর। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ফিরে তিনি বিসিবিকে অবহিত না করেই চীনে যান। কেন্দ্রীয় চুক্তির আওতায় থাকা একজন ক্রিকেটার হিসেবে তার এই বিদেশ সফর নিয়ে বোর্ডের ভেতরে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে, লিটন তখন চোটে ভুগছিলেন এবং তার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে বোর্ডের মেডিকেল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকার কথা ছিল। সেই পরিস্থিতিতে বোর্ডকে না জানিয়ে কীভাবে তিনি দেশের বাইরে গেলেন, সেটিই মূলত শৃঙ্খলা কমিটির বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোববারের শুনানিতে লিটন নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন বলে জানিয়েছেন বিসিবির পরিচালক সিরাজুদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর। তার বক্তব্য অনুযায়ী, শুনানিতে ক্রিকেটারকে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এখন লিটনের বক্তব্যের পাশাপাশি তার চোটের প্রকৃত অবস্থা, চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা এবং বিদেশ সফরের সঙ্গে এসব বিষয়ের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
এ ক্ষেত্রে বিসিবির মেডিকেল কমিটির মতামতও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। শৃঙ্খলা কমিটি লিটনের বক্তব্যের সঙ্গে তার চিকিৎসা ও শারীরিক অবস্থার তথ্য মিলিয়ে দেখবে। এরপরই সিদ্ধান্ত হবে, ঘটনাটিকে কীভাবে বিবেচনা করা হবে এবং তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন কি না।
বিসিবির পক্ষ থেকে অবশ্য বিষয়টিকে আপাতত ইচ্ছাকৃত শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে দেখার কথা বলা হয়নি। বরং বোর্ডের প্রাথমিক ধারণা, ঘটনাটির কেন্দ্রে রয়েছে যোগাযোগের ঘাটতি। তবে কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকা একজন ক্রিকেটারের ক্ষেত্রে বিদেশ ভ্রমণ, বিশেষ করে চোটের সময়, বোর্ডকে না জানিয়ে দেশের বাইরে যাওয়ার বিষয়টি নিয়মের বাইরে পড়তে পারে। তাই ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে লিটনের ক্ষেত্রে কোনো সতর্কতামূলক বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
লিটনের সাম্প্রতিক চোটের ইতিহাসও এই ঘটনার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে জড়িয়ে আছে। চলতি বছর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঘরের মাঠে ওয়ানডে সিরিজে কাফ মাসলের চোটে পড়েন তিনি। সেই চোট থেকে পুরোপুরি সেরে উঠতে না পারায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পরবর্তী টি-টোয়েন্টি সিরিজে খেলতে পারেননি। এরপর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে ওয়ানডে দলে যোগ দিলেও চোটের সমস্যা আবার দেখা দেওয়ায় সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরতে হয় তাকে।
এরপর লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগে খেলার পরিকল্পনা ছিল লিটনের। সেই কারণে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে না খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চোটের কারণে শ্রীলঙ্কার ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতাতেও মাঠে নামা সম্ভব হয়নি তার। দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকা এবং ধারাবাহিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরতে না পারায় লিটনের হতাশার বিষয়টিও বোর্ডের আলোচনায় এসেছে।
চোটের বর্তমান অবস্থা আরও পরিষ্কার করতে ২০ জুলাই লিটনের সিঙ্গাপুরে যাওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে তার শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরামর্শ নেওয়ার কথা রয়েছে। তার চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় বিসিবির মেডিকেল কমিটির ভূমিকা থাকায়, শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্যও বিবেচনায় আসতে পারে।
লিটনের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বড় ধরনের শৃঙ্খলাজনিত বিতর্কের ঘটনা খুব বেশি নেই। বিসিবির পরিচালক সিরাজুদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীরও সেই বিষয়টি সামনে এনেছেন। তার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, এখন পর্যন্ত লিটন ইচ্ছাকৃতভাবে বোর্ডের নিয়ম অমান্য করেছেন—এমন কোনো স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং নির্দিষ্ট সময়ে বোর্ডকে অবহিত না করা এবং প্রয়োজনীয় যোগাযোগ বজায় না রাখাই মূল সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে ক্রিকেটারের পরিচিতি বা দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব কোনোভাবেই নিয়মের বাইরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে না—এমন অবস্থানই বজায় রাখতে চাইছে বিসিবি। কেন্দ্রীয় চুক্তির অধীনে থাকা ক্রিকেটারদের বিদেশ ভ্রমণ, চিকিৎসা, চোটের অবস্থা এবং পুনর্বাসন-সংক্রান্ত বিষয়ে বোর্ডকে নিয়মিত অবহিত করার প্রত্যাশা রয়েছে। কারণ জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের শারীরিক প্রস্তুতি ও প্রাপ্যতা নিয়ে বোর্ডের পরিকল্পনা অনেকাংশেই এসব তথ্যের ওপর নির্ভর করে।
লিটনের ঘটনা তাই শুধু একজন ক্রিকেটারের বিদেশ সফর নিয়ে প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে খেলোয়াড় ও বোর্ডের মধ্যে সমন্বয়, কেন্দ্রীয় চুক্তির শর্ত এবং চোট ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও জড়িত। বিশেষ করে জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে তার অবস্থান বিবেচনায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে।
এখন শৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে বিষয়টি। লিটনের শুনানিতে দেওয়া বক্তব্য, মেডিকেল কমিটির মূল্যায়ন এবং চোটের চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনার পর সম্ভাব্য ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হবে। তবে বিসিবির বর্তমান অবস্থান অনুযায়ী, ঘটনাটিকে বড় ধরনের শাস্তির দিকে না নিয়ে নিয়ম-কানুন মেনে চলার বিষয়ে সতর্কতা এবং ভবিষ্যতে যোগাযোগের ঘাটতি এড়ানোর দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।
মন্তব্য