খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ই জুলাই ২০২৬, ৫:৩৫ পিএম

ফ্রিল্যান্সার ও ব্যক্তি পর্যায়ের সেবা রপ্তানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন আরও সহজ করতে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডিজিটাল সেবা ও অনলাইনভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনাকে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় বিদেশ থেকে আয় গ্রহণ, অর্থ সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে।
বুধবার, ২২ জুলাই, জারি করা এক সার্কুলারে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন নিয়মের ফলে দেশের ফ্রিল্যান্সার ও ব্যক্তি পর্যায়ের সেবা রপ্তানিকারকদের বৈদেশিক আয় দেশে আনার প্রক্রিয়া আগের তুলনায় সহজ ও বাস্তবসম্মত হবে। বিশেষ করে অনলাইনভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রে প্রচলিত কাগজপত্রের পরিবর্তে ইলেকট্রনিক নথিকে গুরুত্ব দেওয়ার ফলে অর্থ গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সময় ও প্রশাসনিক জটিলতা কমতে পারে।
নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ফ্রিল্যান্সাররা তাঁদের বিদেশি আয় গ্রহণের ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্ম স্টেটমেন্ট, ই-মেইল, অনলাইন যোগাযোগের রেকর্ড এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ ব্যবহার করতে পারবেন। অর্থাৎ, কোনো বিদেশি গ্রাহক বা আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কাছ থেকে কাজের পারিশ্রমিক পাওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কাজের প্রমাণ হিসেবে ইলেকট্রনিক নথি ব্যবহার করার সুযোগ থাকবে। এতে প্রচলিত রপ্তানি-সংক্রান্ত কাগজপত্রের ওপর নির্ভরতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নতুন ব্যবস্থায় ২০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ রেমিট্যান্স বা বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থ আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র ছাড়াই গ্রহণ করা যাবে। একই সঙ্গে অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে সেবা প্রদানকারীর মাধ্যমে প্রতি লেনদেনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত অর্থ গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে এসব অর্থ দেশে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে।
ফ্রিল্যান্সারদের জন্য দ্বৈত মুদ্রার ‘ফ্রিল্যান্সার কার্ড’ চালুর সুযোগও নতুন নির্দেশনায় রাখা হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের একটি সহজতর কাঠামো তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী এবং পেমেন্ট সেবা প্রদানকারীদের ব্যবহার আরও বিস্তৃত করার মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রপ্তানি আয়ের বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও নতুন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ফ্রিল্যান্সাররা তাঁদের রপ্তানি আয়ের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রায় রপ্তানিকারকদের সংরক্ষণ কোটায় রাখতে পারবেন। অন্যান্য সেবা রপ্তানিকারকদের ক্ষেত্রে এই সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক সফর, বিদেশি সফটওয়্যার বা অনলাইন সেবা কেনা এবং অন্যান্য বৈদেশিক ব্যয়ের প্রয়োজন মেটাতে এই সংরক্ষিত অর্থ ব্যবহার করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবা খাতে ফ্রিল্যান্সিং দীর্ঘদিন ধরেই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ ও দক্ষ পেশাজীবী বিদেশি গ্রাহকদের জন্য সফটওয়্যার উন্নয়ন, গ্রাফিক নকশা, ডিজিটাল বিপণন, তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তা, অ্যানিমেশন ও অন্যান্য অনলাইন সেবা দিয়ে থাকেন। তাঁদের বড় একটি অংশ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন।
এ ধরনের লেনদেনে প্রথাগত রপ্তানি প্রক্রিয়ার সঙ্গে ডিজিটাল সেবার বাস্তবতার অনেক সময় সামঞ্জস্য থাকে না। নতুন নির্দেশনায় ইলেকট্রনিক প্রমাণ গ্রহণের সুযোগ থাকায় সেই ব্যবধান কিছুটা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে বৈধ ও আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বিদেশি আয় দেশে আনার প্রবণতা বাড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রক্রিয়া সহজ হলে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিদেশি আয় দেশে আনার ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক বা বিকল্প মাধ্যমের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ আরও স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আসার সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে নতুন সুবিধাগুলো কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে ব্যাংক, পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হবে। ফ্রিল্যান্সারদেরও নির্ধারিত নিয়ম, অর্থ প্রত্যাবাসনের সময়সীমা এবং প্রয়োজনীয় ডিজিটাল নথি সংরক্ষণের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। নতুন নির্দেশনা বাস্তবে কতটা সহজে প্রয়োগ করা যায়, তার ওপরই এর সুফল অনেকাংশে নির্ভর করবে।
সব মিলিয়ে, ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সেবা বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনাকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের আশা, বৈদেশিক আয় গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার পাশাপাশি দেশের ফ্রিল্যান্সিং ও ব্যক্তি পর্যায়ের সেবা রপ্তানি খাত আরও সংগঠিত হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে এর অবদান আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠবে।
মন্তব্য