নরসিংদীর রায়পুরায় একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আদালতের তোয়াক্কা না করে স্থানীয় সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার চরাঞ্চলের পাড়াতলী ইউনিয়নের সোনাবালুয়া এলাকায় স্থানীয় এক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্যের নেতৃত্বে এই সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অভিযুক্তদের ২০ লাখ টাকা জরিমানা করার বিনিময়ে এই হত্যার দায় থেকে তাঁদের অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সাথে ভুক্তভোগী পরিবারকে পরবর্তীতে এই ঘটনায় কোনো ধরনের আইনি পদক্ষেপ বা মামলা না করার জন্য পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে।
Table of Contents
বাগবিতণ্ডা, জখম এবং মৃত্যুর ঘটনার বিবরণ
স্থানীয় বাসিন্দা ও ঘটনার বিবরণ থেকে জানা গেছে, গত ২৯ মে সোনাবালুয়া গ্রামে কদম ফুল পাড়াকে কেন্দ্র করে একটি বিরোধের সূত্রপাত হয়। এই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মোবারক মিয়ার ছেলে সজল মিয়ার সঙ্গে একই এলাকার মোক্তার হোসেনের তীব্র বাগবিতণ্ডা ও কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে মোক্তার হোসেন এবং তাঁর সঙ্গে থাকা সহযোগীরা লাঠি দিয়ে সজল মিয়ার মাথায় সজোরে আঘাত করেন। লাঠির আঘাতে সজল মিয়ার মাথার বাঁ পাশে মারাত্মক ও রক্তাক্ত জখম সৃষ্টি হয় এবং তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
আহত সজলকে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করে প্রথমে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবণতি ঘটলে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে দ্রুত ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় টানা ১৪ দিন থাকার পর, গত ১২ জুন সজল মিয়া চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর দিন অর্থাৎ শনিবার রাতে স্থানীয় একটি কবরস্থানে তাঁর মরদেহ দাফন সম্পন্ন করা হয়।
মামলায় বাধা ও মরদেহ দাফনের আগে সালিশ
অভিযোগ উঠেছে, সজল মিয়ার মৃত্যুর খবর আসার পর থেকেই ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন অভিযুক্ত মোক্তার হোসেন ও তাঁর পক্ষের লোকজন। তাঁরা ভুক্তভোগী পরিবারটিকে বিভিন্ন উপায়ে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন এবং থানায় গিয়ে মামলা করার ক্ষেত্রে সরাসরি বাধা সৃষ্টি করেন। এরই ধারাবাহিকতায়, নিহত সজলের মরদেহ দাফন করার পূর্বেই তড়িঘড়ি করে স্থানীয়ভাবে একটি সালিশ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটিকে আদালতের বাইরে নিজেদের মতো করে মীমাংসা করে নেওয়া।
পাড়াতলী ইউনিয়নের স্থানীয় ইউপি সদস্য ইউসুফ মিয়ার প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে এই বিতর্কিত সালিশ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। সালিশে উপস্থিত কয়েকজন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি অভিযুক্তদের মোট ২০ লাখ টাকা জরিমানা প্রদানের শর্ত নির্ধারণ করেন। এই আর্থিক জরিমানার বিনিময়ে বিষয়টি স্থানীয়ভাবে নিষ্পত্তি ঘোষণা করা হয় এবং ভুক্তভোগী পরিবারটিকে ভবিষ্যতে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে আর কোনো আইনি মামলা-মোকদ্দমা না করার জন্য কঠোরভাবে পরামর্শ দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের বক্তব্য ও অভিযুক্তদের অবস্থান
নিহত সজল মিয়ার বড় বোন জেসমিন এই সালিশ এবং ভাইয়ের হত্যার বিষয়ে তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, মোক্তার হোসেন তাঁর ভাইকে মাথায় নির্মমভাবে আঘাত করে হত্যা করেছেন। মেম্বার ও এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি মিলে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে এই গুরুতর ঘটনাটি মীমাংসা করে দিয়েছেন, তবে এখনো সেই টাকাও তাঁরা হাতে পাননি।
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন:
“২০ লাখ টাকার বিনিময়ে কি আমার ভাইকে ফিরে পাব? আমার ভাই বেঁচে থাকলে এর চেয়ে অনেক বেশি আয় করতে পারত। তার জীবন তো সবে শুরু হয়েছিল।”
অর্থের বিনিময়ে এই হত্যার বিচার মেনে নিতে বাধ্য হওয়ার পেছনে পরিবারের ওপর চাপ ছিল বলে জানা যায়। এই ঘটনার পর এলাকায় গিয়ে অভিযুক্ত মোক্তার হোসেন কিংবা তাঁর পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি, ঘটনার পর থেকেই তাঁরা পলাতক রয়েছেন।
ইউপি সদস্য ও পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য
হত্যার মতো ফৌজদারি অপরাধ ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা করার বিষয়টি পাড়াতলী ইউপি সদস্য ইউসুফ মিয়া সরাসরি স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, তিনি নিজে এবং এলাকার কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি মিলে বসে বিষয়টি মীমাংসা করে দিয়েছেন। তবে হত্যার মতো একটি গুরুতর ও জামিনঅযোগ্য অপরাধ সালিশের মাধ্যমে এভাবে নিষ্পত্তি করার কোনো আইনি বৈধতা বা এক্তিয়ার স্থানীয় পর্ষদের আছে কি না, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো সন্তোষজনক বা আইনসম্মত উত্তর দিতে পারেননি।
এই বিষয়ে রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুজিবুর রহমান স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখনো পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত বা মৌখিক মামলা দায়ের করা হয়নি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, হত্যার মতো গুরুতর ঘটনা কোনো অবস্থাতেই আপসযোগ্য নয় এবং সালিশের মাধ্যমে এর নিষ্পত্তি আইনি দৃষ্টিতে অবৈধ। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করা হবে এবং তারা লিখিত অভিযোগ দিলে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
