খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই জুলাই ২০২৬, ৩:৮ এএম

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় ও বিশ্বস্ত গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। তবে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই বাজারে বাংলাদেশের আধিপত্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ইইউর বাজারে প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেশ দ্রুত নিজেদের অবস্থান হারাচ্ছে বাংলাদেশ। ইউরোপে পোশাকের সামগ্রিক চাহিদা হ্রাসের পাশাপাশি স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের আসন্ন উত্তরণ এবং এর পরবর্তী প্রস্তুতি নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মনে তৈরি হওয়া সংশয়ই এই পতনের মূল কারণ।
ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ইইউভুক্ত দেশগুলোর মোট পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯.৯৬ শতাংশ কমেছে। টাকার অঙ্কে যা ৩৭.৫৮ বিলিয়ন ইউরো থেকে ৩৩.৮৪ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে এসেছে।
তবে দেশের পোশাক খাতের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, ইউরোপের সামগ্রিক বাজার যতটা সংকুচিত হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে তাদের পণ্য কেনার হার কমেছে তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। আলোচ্য পাঁচ মাসে বাংলাদেশ থেকে ইইউর পোশাক আমদানি আগের বছরের ৮.৯৭ বিলিয়ন ইউরো থেকে ১৮.৮৯ শতাংশের বিশাল পতনে ৭.২৮ বিলিয়ন ইউরোতে এসে ঠেকেছে। এর ফলে ইইউর মোট পোশাক বাজারে বাংলাদেশের যে অংশীদারিত্ব বা বাজার হিস্যা ছিল, তা ২৩.৯ শতাংশ থেকে কমে ২১.৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
রপ্তানি কমে যাওয়ার এই মন্দা প্রায় সব সরবরাহকারী দেশের ওপরই প্রভাব ফেলেছে, তবে প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য দেশগুলো বাংলাদেশের চেয়ে পরিস্থিতি অনেক ভালোভাবে সামাল দিতে পেরেছে।
ইউরোপের বাজারে কোন দেশের পারফরম্যান্স কেমন ছিল, তার একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
চীন: এই সময়ে ইউরোপের বাজারে চীনের তৈরি পোশাক আমদানি কমেছে মাত্র ৪.২০ শতাংশ।
ভিয়েতনাম: কাঠামোগত সুবিধার কারণে ভিয়েতনামের রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে মাত্র ১.৫১ শতাংশ।
কম্বোডিয়া: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ১০.৭৭ শতাংশ।
ভারত: বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এই প্রতিযোগী দেশের রপ্তানি কমেছে ১৩.৩৩ শতাংশ।
তুরস্ক: ইউরোপের নিকটবর্তী এই দেশটিতে পোশাক আমদানি কমেছে ১৫.৬৬ শতাংশ।
পাকিস্তান: রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মাঝেও দেশটির রপ্তানি কমেছে ১৭.০১ শতাংশ।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বর্তমান পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করে বলেন, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের সময় ঘনিয়ে আসার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা আগেভাগেই তাদের সোর্সিং বা পণ্য সংগ্রহের কৌশলে বড় ধরনের রদবদল আনছেন। ক্রেতারা এখন ধীরে ধীরে ভারতের দিকে ঝুঁকছেন এবং সেখানে নতুন সোর্সিং হাব তৈরি করছেন। কারণ তারা নিশ্চিত যে ভারত আগামীতেও অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা বা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। অন্যদিকে এলডিসি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশকে হয়তো চড়া শুল্কের মুখোমুখি হতে হবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি এড়াতে ক্রেতারা বিকল্প বাজার তৈরি করতে শুরু করেছে।
পণ্যের বৈচিত্র্যহীনতা এবং পরিবেশগত কমপ্লায়েন্সের অভাবকেও এই পতনের জন্য দায়ী করছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার জানান, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়া এখনও প্রথাগত তুলা বা কটন-ভিত্তিক পোশাকের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। বিপরীতে ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো কৃত্রিম তন্তু বা ম্যান-মেইড ফাইবার (MMF) দিয়ে তৈরি পোশাকে নিজেদের সক্ষমতা অনেক শক্তিশালী করেছে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে কৃত্রিম ফাইবারের পণ্যের চাহিদা যখন বাড়ছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই ওই অবকাঠামো থাকা দেশগুলো বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে।
জব্বার আরও বলেন, কার্বন নিঃসরণ নেট-জিরোতে নামিয়ে আনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ক্রেতাদের কাছে এখন পোশাক ক্রয়ের অন্যতম প্রধান শর্ত। এই নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনার ক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত নেট জিরো নিয়ে কোনো স্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা দেখাতে পারেনি। ফলে উচ্চ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট, ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচ ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশের পোশাক খাত ব্যাকফুটে চলে যাচ্ছে।
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম এই পরিস্থিতিকে কেবল পোশাকের চাহিদা হ্রাস হিসেবে দেখছেন না; বরং এটিকে বাজার হিস্যা হারানোর একটি বিপজ্জনক অ্যালার্ম হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, যেখানে ইইউর সামগ্রিক আমদানি কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ, সেখানে আমাদের কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। এটি মূলত এলডিসি উত্তরণের আগে ক্রেতাদের ঝুঁকি কমানোর প্রচেষ্টা এবং ইইউর কঠোর ডিউ-ডিলিজেন্স বাধ্যবাধকতা মেনে চলারই প্রতিফলন।
রপ্তানি আদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়া ঠেকাতে বাংলাদেশকে এখন জরুরি ভিত্তিতে বিভিন্ন বাণিজ্য চুক্তির (FTA/PTA) মাধ্যমে এলডিসি-পরবর্তী বাজারে প্রতিযোগিতামূলক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের চড়া সুদহার কমিয়ে আনা, মূলধনের সুযোগ সহজ করা এবং গ্যাস ও ডিজেলের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বিশ্ববাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্যমতে, পণ্যের দামের ওপরও ক্রমেই চাপ বাড়ছে। ইইউর বাজারে বাংলাদেশের গড় রপ্তানি মূল্য আগের বছরের তুলনায় ৯.৪১ শতাংশ কমে প্রতি কেজিতে ১৩.৯৬ ইউরোতে নেমে এসেছে। একই সময় রপ্তানির পরিমাণও ১০.৪৬ শতাংশ কমে ৫২১.৩৭ মিলিয়ন কেজি হয়েছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা এখন যেমন কম পরিমাণে পোশাক বিক্রি করছেন, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে দামও পাচ্ছেন আগের চেয়ে অনেক কম, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
মন্তব্য