খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই জুলাই ২০২৬, ৩:১৯ এএম

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলায় কলেজছাত্র সুমন শেখ (২৪) হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। হত্যাকাণ্ডের পর থেকে প্রতিপক্ষের অন্তত ১০টি বাড়িতে দফায় দফায় হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাতের অন্ধকারের পাশাপাশি প্রকাশ্য দিবালোকেও এই তাণ্ডব চালানো হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তাদের দাবি, হামলা ঠেকানোর ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি।
গত ২৬ জুন সন্ধ্যায় উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের বড়ভাগ পূর্বপাড়া এলাকায় স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার ও পূর্বশত্রুতার জেরে হামলার শিকার হন সুমন শেখ। তিনি বড়ভাগ গ্রামের আলাউদ্দিন শেখের ছেলে এবং গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার এম এ খালেক ডিগ্রি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। হামলার পর গুরুতর অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। এই হত্যাকাণ্ডের পর তার ভাই শামীম শেখ বাদী হয়ে ১৭ জনকে আসামি করে আলফাডাঙ্গা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
টগরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মিয়া আসাদুজ্জামান জানান, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সাবেক ইউপি সদস্য কুদ্দুস শেখের ছেলে হুসাইন শেখ এবং একই গ্রামের মুরাদ খানের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুরোনো বিরোধ রয়েছে। নিহত সুমন শেখ মূলত মুরাদ খানের সমর্থক হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। দুই পক্ষের এই দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের জেরে অতীতেও বহুবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই বড়ভাগ গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গত ২৯ জুন সন্ধ্যায় হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এলাকায় একটি মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই মানববন্ধনের পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে প্রতিপক্ষের বাড়িঘরকে নিশানা করা শুরু হয়। বড়ভাগ গ্রামের বিভিন্ন মহল্লা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ বাড়ি এখন পুরুষশূন্য এবং এলাকায় এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
হামলাকারীরা কুদ্দুস শেখ, হুসাইন শেখ, উকিল শেখ, এনায়েত শেখ, জনি শেখ, আলিম শেখ, শাহাদাৎ শেখ, আজগর শেখ, উজ্জ্বল শেখ ও রকিব শেখের বাড়িতে ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছে। শত শত লোকের একটি সশস্ত্র দল শাবল ও হাতুড়ি নিয়ে পাকা ও আধা পাকা ঘরবাড়ির দরজা, জানালা, দেয়াল এমনকি ছাদ পর্যন্ত ভেঙে ফেলেছে। বেশ কিছু ঘরের চালের টিনও খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় এবং তাদের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় সরাসরি বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে আলিম শেখের স্ত্রী শাপলা বেগম থানায় দায়ের করার জন্য একটি লিখিত অভিযোগ প্রস্তুত করেছেন। তার স্বাক্ষরিত ওই অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, হামলাকারীরা ঘরের আলমারি ভেঙে নগদ ৫ লাখ টাকা এবং ১৫ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে গেছে। আসবাবপত্র ভাঙচুরের পাশাপাশি মূল্যবান জিনিসপত্র লুটের সময় বাধা দিলে তাকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়।
অভিযোগের বিষয়ে আলফাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফকির ফাইজুর রহমান জানান, এই ধরনের লিখিত অভিযোগ নিয়ে এখনও কেউ থানায় আসেনি। অন্যদিকে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন নিহত সুমনের ভাই ও মামলার বাদী শামীম শেখ। তার দাবি, আসামিপক্ষ গ্রেপ্তার এড়াতে নিজেরা বাড়িঘর ভাঙচুর করে তাদের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। উল্টো আসামিরা এখনও তাদের ৫-৬টি লাশ ফেলার হুমকি দিচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এলাকায় অব্যাহত তাণ্ডব ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি ফকির ফাইজুর রহমান ‘ওপরের নির্দেশ আছে’ জানিয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান এবং জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন। ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. শামসুল আজম বলেন, হত্যা মামলার ১৭ জন আসামির মধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, বাকিদের ধরতে অভিযান চলছে। বাড়িঘরে হামলার বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে এবং এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
এদিকে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেওয়ায় চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলাটির তদন্তের ভার আলফাডাঙ্গা থানা থেকে সরিয়ে ফরিদপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে। পুলিশ লাইনস থেকে অতিরিক্ত আট সদস্যের একটি দল নিরাপত্তার দায়িত্বে পাঠানোর কথা বলা হলেও, সরেজমিনে তদন্তের সময় বড়ভাগ গ্রামে তাদের কোনো উপস্থিতি দেখা যায়নি। ফলে সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতা আরও প্রকট হচ্ছে।
মন্তব্য