খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই জুলাই ২০২৬, ২:১ পিএম

পাবনার ঈশ্বরদীর বাইপাস স্টেশনে রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদ থেকে ১১ বছর বয়সী এক শিশুর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ট্রেনটি স্টেশনে পৌঁছানোর পর কয়েকজন যাত্রীর নজরে আসে ট্রেনের ছাদে নিথর পড়ে থাকা শিশুটির দেহ। খবর পেয়ে রেলওয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করে।
নিহত শিশুটির নাম নিরব হোসেন (১১)। তিনি বগুড়ার ধুনট উপজেলার কুলাগাতি গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত ভিরু মিয়ার ছেলে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে ঠিক কীভাবে তিনি ট্রেনের ছাদে উঠেছিলেন, কোথা থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন এবং কোন পরিস্থিতিতে তার মৃত্যু হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো মন্তব্য করতে নারাজ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ট্রেনটি ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশনে থামার পর কয়েকজন যাত্রী কৌতূহলবশত ছাদের দিকে তাকিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় শিশুটিকে পড়ে থাকতে দেখেন। সঙ্গে সঙ্গে তারা স্টেশন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেন। পরে রেলওয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম শুরু করে।
ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউর রহমান জানান, শিশুটির মাথায় স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, চলন্ত ট্রেনের ছাদে অবস্থান করার সময় কোনো রেলসেতু, ওভারপাস অথবা ট্র্যাকের ওপর থাকা অন্য কোনো স্থাপনার সঙ্গে মাথার সংঘর্ষে এই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এটি কেবল প্রাথমিক অনুমান। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের আলামত এবং তদন্তে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণের পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা হবে।
তিনি আরও জানান, শিশুটির পকেটে থাকা একটি মুঠোফোনের সূত্র ধরে তার পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এরপর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনাটি জানানো হয়। আইনি প্রক্রিয়া এবং ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
রেলওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তে বেশ কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শিশুটি কোথা থেকে ট্রেনে উঠেছিল, সে একা ছিল নাকি অন্য কারও সঙ্গে ভ্রমণ করছিল, যাত্রাপথে কেউ তাকে ট্রেনের ছাদে দেখেছিল কি না এবং ঘটনাটির সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি বা পরিস্থিতির সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি ট্রেনটির যাত্রাপথের বিভিন্ন স্টেশন থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ অত্যন্ত বিপজ্জনক। চলন্ত ট্রেনের ওপর অবস্থান করলে রেলসেতু, ফুটওভারব্রিজ, নিচু স্থাপনা কিংবা অন্যান্য অবকাঠামোর সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি থাকে। অনেক ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক অবকাঠামোও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই ট্রেনের ছাদে যাতায়াত আইনগতভাবে নিরুৎসাহিত এবং যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নিয়মিত সতর্কতা জারি করে থাকে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ করলেই এ ধরনের দুর্ঘটনা পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। যাত্রীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, স্টেশন এলাকায় কার্যকর নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণভাবে ট্রেনে ওঠা রোধে কঠোর ব্যবস্থা এবং অভিভাবকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা—সবকিছু মিলিয়েই দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
নিরব হোসেনের আকস্মিক মৃত্যুতে তার পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে গভীর শোক নেমে এসেছে। এলাকাবাসীও এই মর্মান্তিক ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন। রেলওয়ে পুলিশ বলেছে, তদন্ত শেষ হওয়ার পর ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রকাশ করা হবে এবং প্রয়োজন হলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মন্তব্য