খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুন ২০২৬, ১:৪৩ পিএম

বাংলা গানের ইতিহাসে যাঁদের অবদান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সমানভাবে উচ্চারিত হবে, তাঁদের অন্যতম প্রখ্যাত গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক দেবু ভট্টাচার্য। তাঁর সৃষ্টি শুধু জনপ্রিয় গানেই সীমাবদ্ধ নয়; বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও সঙ্গীতকে বৃহত্তর পরিসরে পরিচিত করে তুলতেও তিনি রেখেছেন অসামান্য ভূমিকা। আজ, ৩০ জুন, তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে এই কিংবদন্তি সুরসাধককে। তাঁর অমর সৃষ্টি—“আমি নদীর মত কতটা পথ ধরে তোমার জীবনে এসেছি”—আজও বাংলা গানের ভাণ্ডারে এক অনন্য সংযোজন হিসেবে বিবেচিত।
১৯৩০ সালের ১ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন দেবু ভট্টাচার্য। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল প্রাণকুমার ভট্টাচার্য। তবে বিদ্যালয়ে তাঁর নাম নিবন্ধিত হয় দেবদাস ভট্টাচার্য হিসেবে। পরবর্তীকালে ‘দেবু ভট্টাচার্য’ নামেই তিনি বাংলা সঙ্গীতজগতে পরিচিতি ও সম্মান অর্জন করেন।
শিল্পীজীবনের শুরুটা ছিল চিত্রকলার মাধ্যমে। ১৯৫০ সালে তিনি কলকাতা আর্ট স্কুল থেকে চিত্রকলায় শিক্ষা সম্পন্ন করেন। তাঁর শিক্ষক ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন। পরে তিনি কিংবদন্তি শিল্পী কামরুল হাসান ও এস এম সুলতানের সান্নিধ্য লাভ করেন। চিত্রকলায় উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজের সৃজনশীলতার প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন সঙ্গীতকে—যে সিদ্ধান্ত পরবর্তীকালে বাংলা গানের ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করে।
১৯৪৫ সালে তিমিরবরণ পরিচালিত একটি অর্কেস্ট্রা দলে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে তাঁর সঙ্গীতজীবনের সূচনা হয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই গীতিকার হিসেবে তাঁর অসাধারণ প্রতিভা প্রকাশ পায়। এরপর ধীরে ধীরে তিনি প্রতিষ্ঠিত হন একজন সফল সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে। একই সঙ্গে নৃত্য ও নাটকের প্রতিও ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ, যা তাঁর সঙ্গীতচিন্তাকে আরও বহুমাত্রিক করে তোলে।
বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে বহু শিল্পীর বিকাশে দেবু ভট্টাচার্যের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। সুরাইয়া মুলতানীকর এবং শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদের শিল্পীজীবনের বিকাশে তিনি প্রত্যক্ষভাবে অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা দিয়েছেন। তাঁর হাত ধরেই অনেক শিল্পী নতুন করে নিজেদের পরিচিতি গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছেন।
১৯৬০-এর দশকে তিনি একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেন, যা সেই সময়ের সাংস্কৃতিক পরিসরে ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি অবাঙালি শিল্পীদের দিয়ে বাংলা গান গাওয়ানোর উদ্যোগ নেন। তাঁর লেখা ও সুরে পাকিস্তানের কিংবদন্তি শিল্পী মেহেদী হাসান, আহমদ রুশদী এবং বাংলাদেশের বশীর আহমদ, শাহনাজ রহমতুল্লাহ, ফেরদৌসী রহমান ও রুনা লায়লাসহ অনেক শিল্পী বাংলা গান পরিবেশন করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এর ফলে বাংলা গান তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানেও নতুনভাবে পরিচিতি লাভ করে এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দেবু ভট্টাচার্য শুধু গীতিকার বা সুরকারই ছিলেন না, একজন দক্ষ বাঁশিবাদক হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছিল। ১৯৫০ সালের দিকে ভারতীয় ধ্রুপদী রাগভিত্তিক তাঁর কয়েকটি বাঁশির রেকর্ড প্রকাশিত হয়, যা সঙ্গীতপ্রেমীদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। পরবর্তী দুই দশকে তিনি ধ্রুপদী, আধুনিক, লোকসঙ্গীত, গজল এবং দেশাত্মবোধক গান—প্রায় সব ধারাতেই অসংখ্য স্মরণীয় সৃষ্টি উপহার দেন। তাঁর সুরে দেশীয় সঙ্গীতধারা ও পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সংগীতের সৃজনশীল সমন্বয় বাংলা গানে একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করে।
দেশের বহু খ্যাতিমান কবির দেশাত্মবোধক কবিতায় তিনি সুরারোপ করেছেন। তাঁর সৃষ্ট গান শুধু বিনোদনের উপাদান নয়, বরং জাতীয় চেতনা, ভালোবাসা ও মানবিক অনুভূতিরও শক্তিশালী প্রকাশ। জীবনের শেষদিকে আন্তর্জাতিক জ্যাজ শিল্পী চিকো হারম্যানের সঙ্গে তাঁর যৌথ ফ্লুট-সিম্ফনি পরিবেশনও সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেবু ভট্টাচার্য ১৯৭৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৯৭ সালে তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
১৯৯৪ সালের ৩০ জুন বাংলা গানের এই প্রবাদপ্রতিম সুরসাধক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে তাঁর বিদায়ে থেমে যায়নি তাঁর সৃষ্টির যাত্রা। বৈচিত্র্যময় সুর, হৃদয়স্পর্শী গীতিকবিতা এবং বাংলা সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করার অসাধারণ অবদানের মাধ্যমে দেবু ভট্টাচার্য আজও বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে উজ্জ্বল, অনুপ্রেরণার এক চিরন্তন নাম। তাঁর গান, তাঁর সুর এবং তাঁর সৃজনশীল উত্তরাধিকার বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।
মন্তব্য