সম্প্রতি দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় ও স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী একটি সাক্ষাৎকারে কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহিরকে নিয়ে একটি চরম মন্তব্য করেছেন। তিনি জহিরকে ‘তৃতীয় শ্রেণীর লেখকও মনে করেন না’ বলে উল্লেখ করার পর সাহিত্যপাড়া থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল ঝড় উঠেছে। তবে এই বিতর্ককে কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাময়িক ট্রল বা অন্ধ সমালোচনা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মীজানুর রহমান এই বিতর্ককে সিগমুন্ড ফ্রয়েড, জ্যাক লাকা এবং আহমদ ছফার মননশীলতার আলোয় ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, এই আপাত তাত্ত্বিক বিরোধের পেছনে লুকিয়ে আছে এক আদিম, অবচেতন ও হিংস্র মনস্তাত্ত্বিক খেলা।
সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপার হলো, লেখক শহীদুল জহির নিজেই তাঁর গল্প ও উপন্যাসে বাঙালির এই পরশ্রীকাতরতা কিংবা সমষ্টিগত ঈর্ষাকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ব্যবচ্ছেদ করে গেছেন। তাঁর বিখ্যাত “সে রাতে পূর্ণিমা ছিল” উপন্যাসের কথা এখানে স্মরণ করা যায়। সেখানে মফিজউদ্দিনের অভাবনীয় বৈভব ও ‘শ্রী’ দেখে পুরো সুহাসপুর গ্রামের মানুষ যেভাবে ফিসফিসানি, কুৎসা আর গুজবের কুয়াশা তৈরি করেছিল, তা ছিল মূলত বাঙালির চিরন্তন সংকীর্ণ মানসিকতার এক বাস্তব রূপ। জহির তাঁর লেখনীতে দেখিয়েছেন যে, সমাজ যখন অন্য কোনো ব্যক্তির ভাষার সার্বভৌমত্ব, মেধা, অনন্যতা বা প্রেমকে সহ্য করতে পারে না, তখন সে সেই সফল মানুষকে টেনে নিচে নামানোর জন্য এক ধরণের সমষ্টিগত হিংস্রতার আশ্রয় নেয়। আজ যখন কিছু বুদ্ধিজীবী জহিরকে ‘তৃতীয় শ্রেণি’ বলে এক ফুঁৎকারে খারিজ করে দিতে চান, তখন ইতিহাস যেন জহিরের সেই উপন্যাসের পাতা থেকেই বাস্তবে জীবন্ত হয়ে ফিরে আসে।
বাঙালির—বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানের এই অদ্ভুত ও আত্মঘাতী মনস্তত্ত্বকে সবচেয়ে নির্মমভাবে তুলে ধরেছিলেন প্রাবন্ধিক আহমদ ছফা। তাঁর কালজয়ী ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে তিনি স্পষ্ট ভাষায় লিখে গেছেন:
“বাঙালি মুসলমানের সমাজটি একটি আত্মকেন্দ্রিক সমাজ। ইহার চোখ বাইরের দিকে অবারিত নহে, নিজের চারিদিকেই ঘুরিয়া ঘুরিয়া মরে। এই সমাজের মানুষ কোন মহৎ সৃষ্টিতে আনন্দ পায় না, কিন্তু অন্যের পতনে একপ্রকার বিকৃত তৃপ্তি অনুভব করে। নিজেরা বড় হতে পারে না বলিয়া, অন্য কেহ বড় হইলে তাহাকে টিনিয়া নিচে নামাইবার এক সর্বগ্রাসী বাসনা এই সমাজকে তাড়াইয়া ফেরে।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কোনো পণ্ডিত ব্যক্তি যখন জহিরের মতো একজন নিভৃতচারী, প্রথাবিরোধী ও মৌলিক রূপকারকে এভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে নাকচ করেন, তখন ছফার ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ গ্রন্থের সেই অমোঘ বাণীটিই আবারও সত্য প্রমাণিত হয়। ছফা লিখেছিলেন, আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ আসলে সুবিধাবাদী ও পরনিন্দুক। তাঁরা নিজেরা কোনো মৌলিক সত্য আবিষ্কার করতে পারেন না, অথচ অন্য কেউ নতুন কিছু সৃষ্টি করলে বা সত্য বললে তা সহ্য করার ক্ষমতাও তাঁদের থাকে না।
এই মনস্তাত্ত্বিক বিরোধকে অস্ট্রিয়ান মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের একটি বিখ্যাত তত্ত্বের সাহায্যে আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। ফ্রয়েডের সেই তত্ত্বটি হলো—’নার্সিসিজম অফ স্মল ডিফারেন্সেস’ বা ক্ষুদ্র পার্থক্যের অহমিকা। যখন দুটি সমগোত্রীয় সত্তা বা সমসাময়িক বুদ্ধিজীবী খুব কাছাকাছি অবস্থান করেন (যেমন দুজনেই যদি ফরাসি তত্ত্ব, নিম্নবর্গীয় ইতিহাস, ইউরোপীয় দর্শন বা উচ্চতর মননশীলতা নিয়ে কাজ করেন), তখন নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ও একাধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য অপরপক্ষকে তীব্রভাবে আক্রমণ করার একটি অবচেতন তাড়না তৈরি হয়। শহীদুল জহির যখন তাঁর স্বতন্ত্র ‘জাদুবাস্তব’ গদ্যশৈলী দিয়ে সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে বিদগ্ধ মহলের মগজ জয় করে নেন, তখন তাত্ত্বিক জগতের সমকক্ষতার কারণে হয়তো কোনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বুদ্ধিজীবীর অবচেতন অহং (Ego) মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়।
এখানে ফ্রয়েডীয় ‘প্রজেকশন’ তত্ত্বটিও খাটানো যায়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যখন নিজের ভেতরের কোনো সুপ্ত খামতি বা সীমাবদ্ধতা (যেমন কালজয়ী ও মৌলিক সৃজনশীল সাহিত্য সৃষ্টি করতে না পারার ব্যর্থতা) সরাসরি নিজের চেতনে মেনে নিতে পারেন না, তখন তিনি অন্যের সেই অসামান্য সৃজনশীলতাকে ‘তৃতীয় শ্রেণি’ বা ‘নিকৃষ্ট’ বলে খাটো করার চেষ্টা করেন। এর মাধ্যমে মূলত তিনি নিজের ভেতরের অবদমিত হিংসা ও ক্ষোভকে শান্ত করতে চান।
ফরাসি মনঃসমীক্ষক জ্যাক লাকা আবার মনে করতেন, মানুষের আকাঙ্ক্ষা সব সময় অন্যের আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। লাকার ভাষায়, পরশ্রীকাতর ব্যক্তি মূলত অন্য ব্যক্তির বস্তুগত ‘প্রাপ্তি’ দেখে ততটা কাতর হয় না, যতটা কাতর হয় অন্যের পরম আনন্দ বা অব্যাখ্যাত আত্মতৃপ্তি (Jouissance) দেখে। শহীদুল জহির তাঁর দীর্ঘ, জটিল ও গোলকধাঁধাময় গদ্যে ভাষার যে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব ও নান্দনিক আনন্দ তৈরি করেছেন, তা অনেক বুদ্ধিজীবীর অতি-তাত্ত্বিক ও উদ্ধৃতি-নির্ভর প্রাতিষ্ঠানিক ভাষার বলয়কে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। তাই জহিরকে সম্পূর্ণ খারিজ (Foreclosure) করে দিয়ে তাঁরা মূলত সাহিত্য বিচারের সর্বোচ্চ মাপকাঠি এবং শেষ কথাটি বলার চাবিকাঠি—অর্থাৎ ‘পরম অন্যের দৃষ্টি’ (The Gaze of the Big Other) নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চান। তাঁরা দেখাতে চান যে, তাঁদের মতামতের বাইরে সাহিত্যের আর কোনো মানদণ্ড হতে পারে না।
শহীদুল জহিরের উপন্যাসে মফিজউদ্দিনের মর্মান্তিক ট্রাজেডির পর যেমন গ্রামের ঈর্ষাপরায়ণ মানুষের মনে এক ধরণের বিকৃত ও সাময়িক স্বস্তি নেমে এসেছিল, জহিরকে তৃতীয় শ্রেণীর লেখক বলে চাবুক মারার ভেতরেও কতিপয় বুদ্ধিজীবী ও তাঁদের অন্ধ অনুসারীদের অবচেতন মন ঠিক একই ধরনের পঙ্কিল তৃপ্তি খুঁজতে চাইছে। জ্যাক লাকার মনঃসমীক্ষণ তত্ত্বে ‘দ্যা নেম অফ দ্যা ফাদার’ (The-Name-of-the-Father) একটি অত্যন্ত মৌলিক ও কেন্দ্রীয় ধারণা। আমাদের সমাজে উদ্ধৃতি-নির্ভর ও পশ্চিমা তত্ত্ব আওড়ানো বুদ্ধিজীবীদের অনুসারীদের কাছে তিনি এক ধরনের ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক পিতা’ বা আইকন হিসেবে অবতীর্ণ হন। সেই অভিভাবকসম ব্যক্তি যখন কোনো ফতোয়া দিয়ে বলেন যে জহির একজন ‘তৃতীয় শ্রেণীর লেখক’, তখন তাঁর অনুসারীরা সেই অনুচ্চারিত ‘পিতৃ আইন’ বা অনুশাসনকে পরম সত্য বলে লুফে নেয়। এর মাধ্যমে তারা জহিরের অনন্য সৃষ্টিশীলতাকে দলবদ্ধভাবে খারিজ করে এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ (Schadenfreude) লাভ করে।
তবে দিনশেষে এই পুরো সংকটের মূলে আহমদ ছফার সেই আরেকটি অমোঘ বাক্যই চিরন্তন সত্য হিসেবে টিকে থাকে—”বাঙালি চরিত্রের সবচেয়ে ট্র্যাজিক দিক হলো সে গুণীর কদর করিতে জানেনা, কিন্তু গুণী মরিয়া গেলে তার শ্রাদ্ধ করিতে ভালোবাসে।” কোনো তাত্ত্বিক ফতোয়া বা ক্ষ্যাপাটে মন্তব্য দিয়ে শহীদুল জহিরের সেই জাদুকরি ও ঘোরলাগা গদ্যকে পাঠকের মন থেকে মুছে ফেলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ জহিরের সাহিত্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেটের তোয়াক্কা করে না; তা চিরকাল টিকে থাকবে তার নিজস্ব ‘শ্রী’ ও মহিমায়।
অধ্যাপক মীজানুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়









