ভেনিজুয়েলায় গত সপ্তাহে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর দেশটির প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার স্যাটেলাইটভিত্তিক প্রাথমিক বিশ্লেষণে ধারণা করা হয়েছে, এই দুর্যোগে দেশজুড়ে প্রায় ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি এখন পর্যন্ত সংগৃহীত স্যাটেলাইট উপাত্তের ভিত্তিতে তৈরি একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন। মাঠপর্যায়ে বিস্তারিত তদন্ত ও প্রকৌশলগত যাচাই শেষ হলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ভেনিজুয়েলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করেছে। উদ্ধারকারীরা এখন পর্যন্ত অন্তত এক হাজার ৭০০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছেন। একই সঙ্গে হাজার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্গত এলাকায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় মৃত ও আহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর অন্যতম। প্রবল কম্পনে বহু আবাসিক ভবন, সরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যাহত হয়েছে। ফলে দুর্গম অঞ্চলের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য এখনও পুরোপুরি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক কোরি শের ও জ্যামন ভ্যান ডেন হোক জানান, ২৫ জুন সংগ্রহ করা স্যাটেলাইট রাডার তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার একটি প্রাথমিক মানচিত্র তৈরি করেছেন। এই বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভূমিকম্পের আগে ও পরের চিত্র তুলনা করলে বহু এলাকায় স্থলভাগের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এবং ভবনের কাঠামোগত ক্ষতির ইঙ্গিত মিলেছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন আংশিক অথবা সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে।
এই মূল্যায়নের জন্য ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার সেন্টিনেল-১ স্যাটেলাইটের উচ্চ রেজোলিউশনের রাডার চিত্র ব্যবহার করা হয়েছে। অপটিক্যাল চিত্রের তুলনায় রাডারভিত্তিক স্যাটেলাইট প্রযুক্তি মেঘ, ধোঁয়া কিংবা রাতের অন্ধকারেও ভূমির পরিবর্তন শনাক্ত করতে সক্ষম। দুর্যোগের পর যখন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হয় না, তখন এ ধরনের প্রযুক্তি উদ্ধারকারী সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে।
গবেষকদের ভাষ্য, স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাব্য মাত্রা সম্পর্কে দ্রুত ধারণা দিতে পারলেও এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। সরেজমিন পরিদর্শন, প্রকৌশলগত মূল্যায়ন এবং স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার পরই প্রকৃত ক্ষতির নির্ভুল চিত্র নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, দেশটির জাতীয় সংসদের সভাপতি জর্জ রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত ৮৫৫টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮৯টি ভবন সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়েছে। সরকারি হিসাব ও স্যাটেলাইটভিত্তিক প্রাথমিক বিশ্লেষণের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর এমন ব্যবধান অস্বাভাবিক নয়। দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহে সময় লাগায় প্রাথমিক সরকারি হিসাব সাধারণত ধাপে ধাপে হালনাগাদ করা হয়।
নাসা জানিয়েছে, তাদের স্যাটেলাইটগুলো ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের নতুন নতুন চিত্র ও উপাত্ত সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে। এসব তথ্যের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা শনাক্ত করা, উদ্ধার অভিযান আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা এবং জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম পরিকল্পনা করা সহজ হচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পরিকল্পনা গ্রহণেও এই স্যাটেলাইটভিত্তিক বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।









