ভারতের কেরালায় এক নাবালিকা ক্রিকেটারকে যৌন নির্যাতনের দায়ে অভিযুক্ত ক্রিকেট কোচ মনু এমকে ৪৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন বিশেষ পকসো আদালত। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ৭৯ হাজার রুপি অর্থদণ্ডও আরোপ করা হয়েছে। তবে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, বিভিন্ন ধারায় ঘোষিত দণ্ড একসঙ্গে কার্যকর হওয়ায় বাস্তবে তাকে ২০ বছর কারাভোগ করতে হবে। এই সাজা আবার তার বিরুদ্ধে আগে ঘোষিত দুটি মামলার দণ্ড ভোগ শেষ হওয়ার পর কার্যকর হবে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ক্রিকেট প্রশিক্ষকের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় নিজের পেশাগত অবস্থান ও ভুক্তভোগীর পরিবারের আস্থার সুযোগ নিয়ে ২০১৮ সালে এক নাবালিকা শিক্ষার্থীকে একাধিকবার যৌন নির্যাতন করেন মনু এম। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত শুরু করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তদন্তে অভিযোগের সমর্থনে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ আইন (পকসো), তথ্যপ্রযুক্তি আইন এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে কেরালার বিশেষ পকসো আদালত মামলার সাক্ষ্য, নথিপত্র, ফরেনসিক উপাত্ত এবং উভয় পক্ষের যুক্তি বিশ্লেষণ করে মনু এমকে সব অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন। আদালত বিভিন্ন অপরাধের জন্য পৃথক পৃথক সাজা ঘোষণা করলেও সেগুলো একযোগে কার্যকর করার নির্দেশ দেন। ফলে ঘোষিত মোট সাজা ৪৭ বছর হলেও কার্যকর কারাদণ্ডের মেয়াদ দাঁড়ায় ২০ বছর। পাশাপাশি আদালতের নির্ধারিত ৭৯ হাজার রুপি জরিমানাও তাকে পরিশোধ করতে হবে।
এটি মনু এমের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া তৃতীয় পকসো মামলার রায়। এর আগে একই ধরনের আরও দুটি মামলায়ও তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, বর্তমান মামলার সাজা আগের দুটি মামলায় ঘোষিত দণ্ড সম্পূর্ণ ভোগ করার পর কার্যকর হবে। ফলে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় ধারাবাহিকভাবে সাজা কার্যকর হওয়ার বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে একাধিক সাবেক শিক্ষার্থী তার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ প্রকাশ্যে আনলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। পরে বিভিন্ন ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে মনু এমের বিরুদ্ধে মোট ছয়টি পকসো মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে তিনটি মামলার বিচার শেষ হয়েছে এবং প্রতিটি মামলাতেই আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। বাকি তিনটি মামলার বিচার এখনো চলমান রয়েছে।
ভারতে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে পকসো আইনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ আইনগুলোর একটি হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০১২ সালে প্রণীত এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুদের যৌন নির্যাতন, যৌন হয়রানি ও শোষণ থেকে সুরক্ষা দেওয়া, দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করা এবং সংবেদনশীল মামলাগুলোর বিচার বিশেষ আদালতের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি করা। এই আইনের আওতায় ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা, শিশু-বান্ধব পরিবেশে সাক্ষ্য গ্রহণ এবং বিচার প্রক্রিয়াকে যতটা সম্ভব কম মানসিক চাপের মধ্যে সম্পন্ন করার বিধানও রয়েছে।
শিশু অধিকার ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা ও ক্রীড়া প্রশিক্ষণের মতো আস্থাভিত্তিক পরিবেশে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। প্রশিক্ষক, শিক্ষক কিংবা অভিভাবকসুলভ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও ক্রীড়া একাডেমিতে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাস্তবায়ন, অভিযোগ গ্রহণের নিরাপদ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চলমান মামলাগুলোর বিচারও দ্রুত সম্পন্ন করে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।









