খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ই জুন ২০২৬, ৫:১৬ পিএম

বাংলার কৃষক-সংগ্রামের ইতিহাসে যে কজন মানুষের নাম চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে, তাঁদের অন্যতম হাজী মোহাম্মদ দানেশ। তিনি শুধু একজন রাজনীতিক নন, ছিলেন শোষিত-বঞ্চিত কৃষকের অধিকার আদায়ের এক নির্ভীক সংগ্রামী, তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক এবং গণমানুষের নেতা।
১৯০০ সালের ২৭ জুন দিনাজপুর জেলার সুলতানপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই তিনি শিক্ষা ও সমাজসেবার প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩১ সালে ইতিহাসে এমএ এবং ১৯৩২ সালে বিএল ডিগ্রি অর্জনের পর দিনাজপুরে আইন পেশায় যুক্ত হন। কিন্তু ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দেশের কৃষক-শ্রমজীবী মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাঁকে বেশি আলোড়িত করেছিল।
১৯৩৮ সালে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিউনিস্ট পার্টির কৃষক সমিতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে উত্তরবঙ্গে কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। জমিদারি প্রথার অবসান, অন্যায় টোল আদায় বন্ধ এবং কৃষকের ন্যায্য অধিকারের দাবিতে তিনি একের পর এক আন্দোলন গড়ে তোলেন। এসব আন্দোলনের কারণে তাঁকে বহুবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করতে হয়।
১৯৪২ সালে নীলফামারীর ডোমারে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় কৃষক সম্মেলনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। সম্মেলনের পর আবারও গ্রেপ্তার হন। কারাগার থেকে বেরিয়েও তিনি থেমে থাকেননি। উত্তরবঙ্গে বর্গাচাষীদের ন্যায্য ফসলের অংশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন সংগঠিত করেন। এই আন্দোলনের নেতা হিসেবেই তিনি সর্বাধিক পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৪৫ সালে মুসলিম লীগে যোগ দিলেও কৃষক আন্দোলনে আপসহীন ভূমিকার কারণে ১৯৪৬ সালে দল থেকে বহিষ্কৃত হন। আবারও কারাবরণ করেন এবং ১৯৪৭ সালে মুক্তি লাভের পর দিনাজপুরের সুরেন্দ্রনাথ কলেজ-এ ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষকতা ও রাজনীতি—দুই ক্ষেত্রেই তিনি আদর্শ ও ন্যায়ের প্রশ্নে ছিলেন দৃঢ়।
১৯৫২ সালে তিনি গণতন্ত্রী দল প্রতিষ্ঠা করেন এবং সভাপতি নির্বাচিত হন। পরে যুক্তফ্রন্টে যোগ দিয়ে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে দিনাজপুর থেকে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেওয়ার পর তাঁকে আবারও কারাগারে যেতে হয়।
১৯৫৭ সালে তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী-এর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন এবং দলের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর ছয় দফার বিরোধিতা করলেও, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন এবং মুজিবনগরে স্বাধীনতার সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
স্বাধীনতার পর তিনি জাতীয় গণমুক্তি ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে বাকশালে যোগদান, আবার নতুন রাজনৈতিক দল গঠন এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় কৃষক পার্টির প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।
১৯৮৬ সালের ২৮ জুন তিনি ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর আদর্শ, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ আজও বাংলার কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে আছে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি
হাজী মোহাম্মদ দানেশ আমাদের শিখিয়েছেন—রাজনীতি ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। শোষিত মানুষের মুক্তির সংগ্রামে তিনি ছিলেন আপসহীন, নির্ভীক ও আদর্শনিষ্ঠ এক মহান নেতা। তাঁর জীবন ও কর্ম আগামী প্রজন্মকে ন্যায়, সাম্য এবং গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অনুপ্রাণিত করবে।
তাঁর ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং তাঁর সংগ্রামী জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণের প্রত্যয় ব্যক্ত করি।
মন্তব্য