খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ই জুন ২০২৬, ১২:৯ এএম

ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে হাজারো মানুষের প্রাণ। পবিত্র আশুরা উপলক্ষে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিলে বিষাক্ত ক্যাপসুল খাইয়ে প্রায় ১৫ হাজার মানুষকে হত্যার এক ভয়াবহ চক্রান্ত নসাৎ করেছে স্থানীয় পুলিশ। গত শুক্রবার (২৬ জুন) তাজিয়া মিছিলে পুষ্টিকর বড়ি ও ব্যথানাশক ওষুধ বলে এই বিষাক্ত ক্যাপসুল বিতরণের সময় ফাইয়াজ প্রেমজি নামের এক ব্যক্তিকে হাতেনাতে আটক করা হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদন থেকে এই লোমহর্ষক তথ্য জানা গেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মুম্বাইয়ের বাইকুল্লা এলাকায় তাজিয়া মিছিল চলাকালে রেয়ে রোডের রেহমতাবাদ কবরস্থানের কাছে সন্দেহভাজন ফাইয়াজকে ক্যাপসুল বিতরণ করতে দেখা যায়। ভিড়ের সুযোগ নিয়ে সে এগুলোকে ব্যথানাশক ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধিকারী ওষুধি বড়ি বলে প্রচার করে মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছিল। ফাইয়াজের দেওয়া এই ক্যাপসুল সেবন করে মুহূর্তের মধ্যেই অন্তত ১১ জন মানুষ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। আক্রান্তদের মধ্যে সালমান সাইয়েদ নামের এক ব্যক্তি প্রথম পেটব্যথা ও তীব্র বমির অভিযোগ করেন। অসুস্থদের দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের সুচিকিৎসায় বর্তমানে তারা সবাই আশঙ্কামুক্ত রয়েছেন।
পরবর্তীতে ওই ক্যাপসুলগুলো ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হলে লোহমর্ষক তথ্য বেরিয়ে আসে। পরীক্ষায় দেখা যায়, ক্যাপসুলগুলোতে মেশানো ছিল ‘জিংক ফসফাইড’। এটি মূলত ইঁদুর মারার বিষ এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক কীট দমনে ব্যবহৃত অত্যন্ত প্রাণঘাতী ও তীব্র বিষাক্ত এক রাসায়নিক উপাদান। জিজ্ঞাসাবাদে ধৃত ফাইয়াজ প্রেমজি পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে যে, মিছিলে অংশ নেওয়া হাজার হাজার মানুষকে বিষপ্রয়োগে মারার একটি সুদূরপ্রসারী ছক ছিল তার। সে ঠান্ডা মাথায় পুলিশকে বলে, ‘আমি অন্তত ১৫ হাজার মানুষকে হত্যা করতে চেয়েছিলাম।’
শনিবার (২৭ জুন) স্থানীয় আদালত অভিযুক্ত ফাইয়াজকে দুই দিনের পুলিশ হেফাজতে (রিমান্ড) পাঠিয়েছে। মুম্বাই পুলিশের উপকমিশনার (ডিসিপি) জয়ন্ত মীনা জানান, এ ধরনের কোনো ওষুধ বা ক্যাপসুল বিতরণের জন্য ফাইয়াজের কাছে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা বৈধ অনুমোদন ছিল না। পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তের কাছ থেকে অন্তত ১৪ হাজার ৯০০টি বিষাক্ত ক্যাপসুল জব্দ করেছে। এছাড়া সে আরও ৩০ হাজার খালি ক্যাপসুল এবং ৫০ কেজি ফসফরাসের অর্ডার দিয়েছিল বলে তদন্তে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, বড় ধরনের কোনো নাশকতার অংশ হিসেবেই এই বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত উপাদান মজুত করা হচ্ছিল।
এই বিশাল ট্র্যাজেডি থেকে হাজারো মানুষের প্রাণ বাঁচানোর পেছনে বড় অবদান রেখেছেন তিন নারী স্বেচ্ছাসেবক। মিছিলে দায়িত্ব পালনকালে তাদের একজন প্রথমে ফাইয়াজের সন্দেহজনকভাবে ক্যাপসুল বিতরণের বিষয়টি লক্ষ করেন। কোনো প্রেসক্রিপশন ছাড়া এভাবে ওষুধ বিলাতে দেখে তাদের মনে খটকা লাগে। তারা সঙ্গে সঙ্গে ফাইয়াজকে বাধা দেন এবং বাইকুল্লা থানা পুলিশকে খবর দেন। একই সঙ্গে উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে তারা তাৎক্ষণিকভাবে লাউডস্পিকারে ঘোষণা দিয়ে মিছিলে আসা সবাইকে ওই ক্যাপসুল খাওয়া থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান। তাদের এই তাৎক্ষণিক তৎপরতার কারণেই মূলত এক ভয়ংকর বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায় মুম্বাই।
অভিযুক্ত ফাইয়াজের বিরুদ্ধে বাইকুল্লা থানায় নবগঠিত ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’ (বিএনএস)-এর ১২৩ ধারায় মামলা করা হয়েছে। এই ধারায় বিষ বা অনুরূপ ক্ষতিকর উপায়ে মানুষের ক্ষতিসাধনের মাধ্যমে অপরাধের উদ্দেশ্যকে কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই পৈশাচিক পরিকল্পনার পেছনে অন্য কোনো উগ্রপন্থী বা সন্ত্রাসী সংগঠনের যোগসাজশ কিংবা অর্থায়ন আছে কি না, তা জানতে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
এই চক্রান্তে ব্যবহৃত জিংক ফসফাইড রাসায়নিকটি মানবদেহের জন্য কতটা বিপজ্জনক, তা নিচে কয়েকটি পয়েন্টের মাধ্যমে স্পষ্ট করা হলো:
রাসায়নিক প্রকৃতি: জিংক ফসফাইড অত্যন্ত তীব্র ও মারাত্মক বিষাক্ত একটি অজৈব যৌগ।
শরীরে অভ্যন্তরীণ বিক্রিয়া: এটি মানুষের পেটে প্রবেশ করার পর পাকস্থলীর হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের সংস্পর্শে আসবামাত্র তীব্র বিক্রিয়া ঘটায়।
ফসফিন গ্যাস উৎপাদন: এই বিক্রিয়ার ফলে মানবদেহে অত্যন্ত প্রাণঘাতী ও বিষাক্ত ‘ফসফিন গ্যাস’ উৎপন্ন হতে শুরু করে।
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি: এই গ্যাস সরাসরি মানুষের হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, যকৃত (লিভার), কিডনি এবং মস্তিষ্ককে আক্রমণ করে স্থায়ীভাবে অকেজো করে দেয়।
নির্দিষ্ট প্রতিষেধকের অভাব: এই বিষক্রিয়ার সবচেয়ে বড় জটিলতা হলো, চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর সুনির্দিষ্ট বা সরাসরি কোনো অ্যান্টিডোট (प्रतिষেধক) নেই।
চিকিৎসা পদ্ধতি: জিংক ফসফাইডের বিষক্রিয়া ঘটলে রোগীকে বাঁচানোর একমাত্র উপায় হলো অবিলম্বে হাসপাতালে নেওয়া। সেখানে লক্ষণভিত্তিক পাকস্থলী পরিষ্কারকরণ (গ্যাস্ট্রিক ল্যাভেজ) এবং জীবনরক্ষাকারী ভেন্টিলেটর সহায়তার মাধ্যমে রোগীকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়।
মন্তব্য