খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ই জুন ২০২৬, ৬:২৩ পিএম

নেত্রকোনায় যৌতুকের দাবিতে দীর্ঘদিন নির্যাতনের পর স্ত্রীকে হত্যার দায়ে শফিকুল ইসলাম (৪২) নামে এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
বুধবার (২৪ জুন) দুপুরে নেত্রকোনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক একেএম এমদাদুল হক বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত শফিকুল ইসলাম আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
একই মামলায় অভিযুক্ত শফিকুল ইসলামের বাবা তোরাব আলী ও মা সখিনা খাতুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাদের বেকসুর খালাস দিয়েছেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে সাক্ষ্য-প্রমাণ, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে আদালত এ সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
আদালত সূত্রে জানা যায়, নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার রত্নপুর গ্রামের বাসিন্দা সোনা মিয়ার মেয়ে পারভীন আক্তারের সঙ্গে প্রায় এক দশক আগে কলমাকান্দা উপজেলার ক্ষুদ্র সিধলী গ্রামের শফিকুল ইসলামের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে দুই ছেলে সন্তান রয়েছে। বিয়ের পর প্রথমদিকে স্বাভাবিকভাবে সংসার চললেও পরবর্তীতে যৌতুকের দাবিকে কেন্দ্র করে দাম্পত্য জীবনে অশান্তি শুরু হয়।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, বিয়ের পর থেকেই শফিকুল ইসলাম এবং তার পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সময় পারভীনের পরিবারের কাছে অর্থ দাবি করতেন। ২০১৯ সালের ২৫ মার্চ শফিকুল ইসলাম এক লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। পারভীন ওই টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠলে তিনি বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন।
পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সালিশ বৈঠকের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়। সালিশের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পারভীন আবার স্বামীর বাড়িতে ফিরে যান এবং সংসার শুরু করেন। কিন্তু সেই সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৬ এপ্রিল গভীর রাতে পারভীনের মৃত্যুর খবর তার পরিবারের কাছে পৌঁছায়। খবর পেয়ে স্বজনরা শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ঘরের বারান্দায় তার মরদেহ দেখতে পান। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, যা মৃত্যুর ঘটনাকে আরও সন্দেহজনক করে তোলে।
ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে এবং মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
এ ঘটনায় পারভীনের ভাই মো. আবু ইউসুফ বাদী হয়ে কলমাকান্দা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। মামলায় শফিকুল ইসলাম, তার বাবা-মা এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মো. নুরুল কবির রুবেল জানান, দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং উপস্থাপিত প্রমাণাদি পর্যালোচনা করে আদালত শফিকুল ইসলামকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। একই সঙ্গে অপর দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের খালাস দেওয়া হয়েছে।
এই রায়ের মাধ্যমে যৌতুক-সংক্রান্ত সহিংসতা ও নারীর প্রতি নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর অবস্থান আবারও স্পষ্ট হলো বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
মন্তব্য