অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় নয় ডিবেটিং সোসাইটির অনুষ্ঠানে সাদিক কায়েম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি ও ছাত্রশিবির নেতা সাদিক কায়েম এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে যুক্তরাজ্যে গেছেন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন দাবিটি সত্য নয় বলে নিশ্চিত করেছে তথ্য যাচাইকারী (ফ্যাক্ট চেকিং) প্রতিষ্ঠান ‘রিউমার স্ক্যানার’সহ একাধিক নির্ভরযোগ্য ফ্যাক্টচেকার।

ফ্যাক্টচেকারদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তারা মূলত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আমন্ত্রণে সেখানে যাননি। বরং ‘অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটি’ নামের একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন সংগঠনের আমন্ত্রণে অক্সফোর্ড ইউনিয়ন সোসাইটির ডিবেটিং চেম্বারে আয়োজিত একটি বিশেষ প্যানেল আলোচনা এবং মতবিনিময় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবি ও বিতর্কের সূত্রপাত

সম্প্রতি ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট, পেজ এবং খোদ সাদিক কায়েমের একটি ভিডিও বক্তব্যে দাবি করা হয়, বাংলাদেশের সমসাময়িক চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে কথা বলতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বিশেষ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সেই রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক আমন্ত্রণের ভিত্তিতেই তারা যুক্তরাজ্য সফরে গেছেন বলে প্রচার করা হয়।

এই খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। অনেকেই এটিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করতে শুরু করেন, যা পরবর্তীতে ফ্যাক্টচেকারদের নজর কাড়ে।

অক্সফোর্ড ইউনিয়নের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় ও স্বাধীনতা

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী শিক্ষার্থী সংবাদমাধ্যম ‘চেরওয়েল’ (Cherwell)-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং অক্সফোর্ড ইউনিয়নের নিজস্ব দাপ্তরিক ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ‘অক্সফোর্ড ইউনিয়ন’ একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন বিতর্ক সংগঠন। এটি কোনোভাবেই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি কোনো অংশ বা অনুষদ নয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে এটি পরিচালিত হয় না।

যদিও এই ঐতিহাসিক সংগঠনটি মূলত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে এবং বিশ্বজুড়ে এটি অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী বিতর্ক মঞ্চ হিসেবে পরিচিত, তবুও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে এর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা বা সংযোগ নেই। ফলে এই মঞ্চে আয়োজিত কোনো অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ হিসেবে গণ্য করার কোনো সুযোগ নেই।

অনুষ্ঠানের আয়োজক ও বক্তাদের বিবরণ

অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটির অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম পেজে প্রকাশিত তথ্য এবং বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, উক্ত প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠানে হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সাদিক কায়েম ছাড়াও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বক্তা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানের মূল বিবরণ:

  • আমন্ত্রণকারী সংগঠন: অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটি (একটি স্বাধীন সংগঠন)।

  • অন্যান্য বক্তা: নাবিলা ইদ্রিস ও আলিয়ার রহমান।

  • নিবন্ধন ফরমের শিরোনাম: “Oxford Union-Bangla Society Bangladesh Panel: Meet and Greet”।

অর্থাৎ, এটি ছিল অক্সফোর্ড ইউনিয়নের বিতর্ক কক্ষে আয়োজিত অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটির একটি প্যানেল আলোচনা এবং পরিচিতি সভা।

ফ্যাক্টচেকারদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও পর্যবেক্ষণ

সার্বিক তথ্য-প্রমাণ, দাপ্তরিক নথিপত্র এবং ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট অনুসন্ধান শেষে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ফ্যাক্টচেকাররা নিশ্চিত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেছেন যে, হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সাদিক কায়েম অক্সফোর্ড ইউনিয়নের একটি নির্দিষ্ট কক্ষে কেবল একটি স্বাধীন সংগঠনের আমন্ত্রণে প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়েছেন।

অতএব, ‘অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে’ বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিশেষ নিমন্ত্রণে তারা যুক্তরাজ্য সফরে গেছেন বলে ফেসবুক ও অন্যান্য মাধ্যমে যে দাবিটি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বিভ্রান্তিকর। তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে এমন একটি স্বাধীন ও শিক্ষার্থী পরিচালিত সংগঠনের অনুষ্ঠানকে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে।