সরকারি চা-বাগানে ‘ভুতুড়ে’ শ্রমিকের কেলেঙ্কারি

মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সরকারি চা-বাগানগুলোতে খাতায় নাম থাকা সত্ত্বেও বহু শ্রমিকের অস্তিত্ব নেই। সরকারি বেতন, প্রভিডেন্ট ফান্ড, হাজিরা ও রেশন তালিকায় সই থাকা এই শ্রমিকদের কেউ মৃত, কেউ অবসরপ্রাপ্ত, কেউবা বাস্তবেই নেই। তথাপি, গত পাঁচ বছর ধরে তারা নিয়মিত বেতন ও ভাতা তুলছেন।

নিউ সমনবাগ চা-বাগানে ২১ ফেব্রুয়ারি সরেজমিনে গেলে শ্রমিকদের কাছ থেকে জানা গেছে, তালিকাভুক্ত শ্রমিক দ্বীপনারায়ণ, শচীন, সুজন ও কবিতা কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। অথচ খাতায় তারা এখনো সক্রিয়। সরকারি চারটি চা-বাগানের মধ্যে সবচেয়ে বড় নিউ সমনবাগে কাজ করেন ১ হাজার ৮২০ জন। চা বোর্ডের তদন্তে অন্তত ৪০ জন মৃত বা অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকের খোঁজ পাওয়া গেছে। এছাড়া আরও ১৭০ জন ভুয়া নাম-ঠিকানায় বেতন তুলছেন।

তদন্ত ও হামলার ঘটনা

চা বোর্ডের ছয় সদস্যের তদন্ত দল ৫ জানুয়ারি থেকে ৯ দিন ধরে বাগানে অনুসন্ধান চালায়। প্রভিডেন্ট ফান্ড, রেশন তালিকা ও নিয়োগপত্র মিলিয়ে অসংগতি ধরা পড়ে। ১৩ জানুয়ারি ফেরার সময় বাগানের ‘ভুয়া’ শ্রমিকেরা তদন্ত দলের ওপর হামলা চালায় এবং প্রায় দেড় ঘণ্টা তাদের অবরুদ্ধ করে রাখে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ হাজার ৮২০ জন শ্রমিকের মধ্যে কেবল ৩১৫ জনের তথ্য সঠিক। ১ হাজার ১৬০ জনের নিয়োগপত্র জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে মেলেনি। ৮০ জনের বয়স ৬০-এর বেশি, অথচ তারা এখনও তালিকায় আছেন। এভাবে প্রতি মাসে সরকারি খাত থেকে প্রায় ১ কোটি টাকা, বছরে ১২ কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে।

উৎপাদন ও শ্রমিকের তুলনা

নিচের টেবিলে সরকারি ও বেসরকারি চা-বাগানের তুলনা দেওয়া হলো:

বাগান নামজমি (একর)শ্রমিক সংখ্যা২০২৪ চা উৎপাদন (কেজি)নিলামমূল্য সর্বোচ্চ (টাকা/কেজি)মাথাপিছু উৎপাদন (কেজি/শ্রমিক)
নিউ সমনবাগ২,৯০৬১,৮২০৭,৯২,০০০২১০৪৩৫
মধুপুর (বেসরকারি)৯৩০৬৫৫৮,৮৭,০০০২৭৭১,৩৫৩
করিমপুর (বেসরকারি)১,৩০২১,৭৯২১৫,৬৪,৪৫০২২০৮৭৩

টেবিল থেকে দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি চা-বাগান তুলনায় অর্ধেক জমি ও কম শ্রমিকে বেশি উৎপাদন করছে।

বাগানের স্থিতি ও সমস্যা

নিউ সমনবাগে ২০১৫-২০২৫ মধ্যে নতুন চারা লাগানোর জন্য ১৭ কোটি টাকা পাওয়া গেছে, কিন্তু বাগানের ৩০ শতাংশ জমি ফাঁকা। গাছের গড় বয়স ৪৫ বছর, ফলে উৎপাদন ও মান কম। বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত হওয়ায় চায়ের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

চা বোর্ড ২০২৫ সালের অক্টোবরে স্থায়ী আমানত ভেঙে দেওয়া টাকা ফেরত চেয়ে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ঋণ হিসেবে দেয়া অর্থ বিনিয়োগ করলে বার্ষিক ন্যূনতম ১০% মুনাফা আসত, কিন্তু তা না হওয়ায় বোর্ড আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত।

সম্ভাবনা ও উদ্যোগ

ন্যাশনাল টি কোম্পানির অধীনে পরিচালিত ১২টি চা-বাগানের মধ্যে নিউ সমনবাগ সর্ববৃহৎ। চেয়ারম্যান মামুনুর রশিদ জানান, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু সংকট চিহ্নিত হয়েছে। ২০ জন ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার নেওয়া হচ্ছে। গ্রিন টি, হোয়াইট টি, ইয়েলো টি ও এক্সপেরিমেন্টাল টি উৎপাদনের দিকে এগোচ্ছে বাগান, যা আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি করবে।

তবে, সরকারি বাগানগুলোর দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার মধ্যে রয়েছে লোকসান, শ্রমিক দক্ষতার ঘাটতি, রাজনৈতিক নিয়োগ, বিনিয়োগের অভাব ও ব্যাংকঋণে উচ্চ সুদ।

নতুন উদ্যোগ ও দক্ষ পরিচালনার মাধ্যমে বাগানের আর্থিক ও উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে, যা সরকারি খাতের অপচয় কমিয়ে চায়ের মান ও বাজারমূল্য উন্নত করতে পারে।